অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

সংশোধিত পাবলিক ইস্যু বিধিমালার প্রভাবে দেশের পুঁজি বাজারে নতুন কোম্পানির আগমন কার্যত থমকে আছে। বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, অন্তত আরও পাঁচ মাস নতুন কোনো আইপিও প্রস্তাব আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ। নতুন বিধিমালা কার্যকর হলেও কোম্পানিগুলোর আগ্রহ এখনও প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যা শেয়ার বাজারের সামগ্রিক গতিশীলতায় প্রভাব ফেলছে।

বর্তমান বিধান অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি বার্ষিক, অর্ধবার্ষিক বা প্রান্তিক নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে আইপিও আবেদন করতে পারে। তবে বাস্তবে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই নিরীক্ষিত বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদনকে প্রাধান্য দেয়, কারণ এটি বিনিয়োগকারীদের কাছে তুলনামূলক বেশি গ্রহণযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য।

গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর থেকে সংশোধিত আইপিও বিধিমালা কার্যকর হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ২০২৫ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ব্যবহার করে কোনো প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক শেয়ার ছাড়ার আবেদন করেনি, যা বাজারে এক ধরনের অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, অর্থবছর শেষ হওয়ার ১২০ দিনের মধ্যে আইপিও প্রস্তাব জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। ক্যালেন্ডার বছর অনুসরণকারী কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত। তবে ইস্যু ব্যবস্থাপক ও সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সময়সীমার মধ্যেও নতুন প্রস্তাব জমা পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম।

এর পেছনে প্রধান কারণ হলো আর্থিক প্রতিবেদন প্রস্তুত ও অনুমোদনের দীর্ঘ প্রক্রিয়া। একটি অর্থবছর শেষ হওয়ার পর আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করতে কমপক্ষে এক মাস সময় লাগে। এরপর নিরীক্ষা সম্পন্ন করা, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন নেওয়া—সব মিলিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি শেষ করতে সাধারণত দুই মাসের কম সময় লাগে না।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক মাসের মধ্যে নিরীক্ষা সম্পন্ন করা বাস্তবসম্মত নয়। ফলে ২০২৬ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী ব্যবহার করে আইপিও আনতে হলে কোম্পানিগুলোকে আরও অন্তত পাঁচ মাস অপেক্ষা করতে হবে, যা পুঁজি বাজারে নতুন বিনিয়োগের প্রবাহ বিলম্বিত করছে।

অতীতে আইপিও অনুমোদন প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতার কারণে সমালোচিত ছিল। কিছু ক্ষেত্রে এক বছরেরও বেশি সময় লেগেছে অনুমোদন পেতে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন বিধিমালায় প্রক্রিয়াটি দ্রুততর করতে স্টক এক্সচেঞ্জ, ইস্যু ব্যবস্থাপক ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) স্টক এক্সচেঞ্জের সুপারিশের ভিত্তিতে সর্বোচ্চ ২০ দিনের মধ্যে আইপিও প্রস্তাব গ্রহণ বা বাতিল করার সিদ্ধান্ত নেবে। এছাড়া ফিক্সড প্রাইস পদ্ধতিতে ৪০ দিনের মধ্যে এবং বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৫৩ দিনের মধ্যে পুরো অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে।

নতুন বিধিমালার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মূল্য নির্ধারণে নমনীয়তা বৃদ্ধি। শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি থাকলে কোম্পানিগুলো এখন আগের তুলনায় বেশি প্রিমিয়াম দাবি করতে পারবে। পূর্বে মূল্য নির্ধারণে সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের প্রকৃত মূল্যায়ন পেত না বলে অভিযোগ ছিল।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতামতের ভিত্তিতে প্রণীত এই নতুন বিধিমালায় একাধিক মূল্যায়ন পদ্ধতি ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে, যাতে তালিকাভুক্তির পথে জটিলতা ও বিলম্ব কমানো যায়। তবুও এখন পর্যন্ত নতুন নিয়মে কোনো কোম্পানি আইপিও প্রস্তাব জমা না দেওয়া পুঁজি বাজারের বর্তমান স্থবিরতাকেই স্পষ্টভাবে তুলে ধরছে।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে টেকনো ড্রাগস আইপিও প্রস্তাব জমা দেয়। এরপর থেকে আর কোনো নতুন কোম্পানি শেয়ার বাজারে আসেনি, যা বাজারের গভীর স্থবিরতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অকা/পুঁবা/ই/দুপুর/৫ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 10 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version