অর্থকাগজ প্রতিবেদন
টানা প্রায় চার বছর ধরে দেশে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে আটকে আছে। জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় মজুরি ও বেতন বৃদ্ধির হার অনেক পিছিয়ে পড়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে আমদানিনির্ভর ভোক্তা বাজারে। একসময় মধ্য ও উচ্চবিত্তের নিত্যব্যবহারের তালিকায় থাকা বিদেশি প্রসাধনী, চকোলেট, জুতা কিংবা লাইফস্টাইল পণ্য এখন অনেকের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফলে বাজারজুড়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের নীরব স্থবিরতা।
ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি কিংবা চট্টগ্রামের অভিজাত বিপণিবিতানগুলোতে এখন একই চিত্র। প্রিমিয়াম পণ্যের তাক আগের মতো ঝলমলে নয়, ক্রেতার ভিড়ও কমে গেছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বিক্রেতারা বলছেন, যেসব গ্রাহক আগে দামের দিকে না তাকিয়ে কেনাকাটা করতেন, তারাও এখন একাধিক দোকান ঘুরে দাম যাচাই করছেন অথবা অনেক ক্ষেত্রে কেনাকাটা স্থগিত রাখছেন।
বাজারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে আমদানিকৃত এফএমসিজি ও পার্সোনাল কেয়ার পণ্যে। একসময় সুপারশপের তাকজুড়ে থাকা জিলেট রেজর, হেড অ্যান্ড শোল্ডার্স, ওরাল-বি, ফেরেরো রোশার বা কিটক্যাটের মতো পণ্য এখন অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত। কোথাও কোথাও দেশি বিকল্প পণ্য সেই জায়গা দখল করেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিদেশি ব্র্যান্ডের পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়ায় পুরো খুচরা বাজারের চরিত্রই বদলে যাচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, লাইফস্টাইল ও ফ্যাশন পণ্যের বিক্রি ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। একইভাবে আমদানিকৃত চকোলেট ও খাদ্যপণ্যের বাজারেও বড় ধস নেমেছে। আগে যেখানে বিদেশি ব্র্যান্ডের আধিপত্য ছিল, এখন সেখানে দেশি পণ্যের অংশ বাড়ছে দ্রুত। আমদানিকারকরা বলছেন, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ শুল্ক, এলসি খোলায় কড়াকড়ি এবং টাকার অবমূল্যায়নের কারণে বিদেশি পণ্যের দাম এতটাই বেড়েছে যে সাধারণ ভোক্তারা সেগুলো থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।
সুপারশপগুলোতেও এই পরিবর্তন স্পষ্ট। কয়েক বছর আগেও যে কিটক্যাট ২৫ টাকায় বিক্রি হতো, এখন তার দাম প্রায় দ্বিগুণ। ফেরেরো রোশারের মতো প্রিমিয়াম চকোলেটের দাম চার বছরে ৭০০ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকায় পৌঁছেছে। একইভাবে সিরিয়াল, স্কিনকেয়ার ও শিশুখাদ্যের মতো পণ্যের দামও অনেক ক্ষেত্রে দ্বিগুণ হয়েছে।
খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, ক্রেতাদের আচরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। এখন অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া আমদানিকৃত পণ্য কিনতে চাইছেন না। কেউ কেউ নির্দিষ্ট পণ্য খুঁজতে একাধিক দোকান ঘুরছেন, আবার অনেকে অনলাইনে খুঁজলেও উচ্চমূল্য বা ‘আউট অব স্টক’ সমস্যার মুখে পড়ছেন।
ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে ডলার সংকট শুরুর পর সরকার বিলাসজাত পণ্যের আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। খাদ্য ও জরুরি পণ্যের এলসিকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় চকোলেট, কসমেটিকস, ফ্যাশন ও গাড়ির মতো পণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। পরবর্তীতে কিছু বিধিনিষেধ শিথিল হলেও বাজার আগের অবস্থায় আর ফিরতে পারেনি।
বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড পরিচালনাকারী বড় প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন চাপের মুখে। নাইকি, পুমা, অ্যাডিডাস, লেভিস কিংবা জিওর্ডানোর মতো ব্র্যান্ডের বিক্রয় কার্যক্রম পরিচালনাকারীরা বলছেন, ক্রেতাদের ব্যয় সংকোচন ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিক্রি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিপুল ছাড় দিয়েও পণ্য বিক্রি বাড়ানো যাচ্ছে না। নতুন কালেকশন আনার আগেই পুরোনো স্টক জমে থাকছে।
সুপারশপগুলোর ‘প্রিমিয়াম’ ভাবমূর্তিও ক্ষয় হচ্ছে দ্রুত। আমদানিকৃত প্রসাধনী, স্কিনকেয়ার কিংবা স্ন্যাকসের তাক এখন আগের তুলনায় অনেক ফাঁকা। অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে দেশি বিকল্প পণ্যের ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, উচ্চমূল্যের কারণে অনেক ক্রেতাই এখন বিদেশি পণ্য কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছেন।
প্রিমিয়াম লাইফস্টাইল খাতেও একই চিত্র। বিউটি, ফ্যাশন ও বিলাসপণ্যের বিক্রি সচল রাখতে বড় বড় ব্র্যান্ডকে এখন ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিতে হচ্ছে। তবুও শপিংমলগুলোতে আগের মতো ক্রেতা দেখা যাচ্ছে না। মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন উৎসব বা প্রয়োজন ছাড়া শৌখিন কেনাকাটা এড়িয়ে চলছে।
আমদানিকারকরা আরও বলছেন, কাস্টমস মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে অনেক পণ্যের ‘মিনিমাম অ্যাসেসেবল ভ্যালু’ বাড়ানো হয়েছে। ফলে শুল্ক বেড়ে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে ছোট আমদানিকারকদের অনেকেই ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে উঠেছে বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান Procter & Gamble–এর কার্যক্রম গুটিয়ে নেওয়া। প্রায় তিন দশক ব্যবসা পরিচালনার পর ২০২৫ সালের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটি তাদের প্রধান ডিস্ট্রিবিউশন কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এর ফলে জিলেট, প্যাম্পার্স, ওরাল-বি ও ওলের মতো জনপ্রিয় পণ্য বাজারে আরও দুর্লভ হয়ে পড়ে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, টানা মূল্যস্ফীতি, ডলারের অস্থিরতা, এলসি সংকট এবং ভোক্তাদের আস্থাহীনতা মিলিয়ে পুরো প্রিমিয়াম বাজার এখন কঠিন সময় পার করছে। উচ্চ আয়ের পরিবারগুলোও এখন ব্যয়ের ক্ষেত্রে আগের তুলনায় অনেক বেশি সতর্ক। ফলে বিলাসপণ্য খাতে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে, তা শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি ভোক্তাদের মানসিকতা ও আস্থার সংকটেরও প্রতিফলন।
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 hours আগে

