অর্থকাগজ প্রতিবেদন

দেশের শেয়ার বাজারে দীর্ঘদিনের আস্থাহীনতা এখন শুধু সূচকের ওঠানামায় নয়, বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মানসম্পন্ন কোম্পানির সংকট, দীর্ঘ সময় ধরে নতুন প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) কার্যত বন্ধ থাকা, দুর্বল কোম্পানির আধিক্য, করপোরেট সুশাসনের ঘাটতি এবং বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিক লোকসানের কারণে পুঁজি বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ মিলেছে বেনিফিশিয়ারি ওনার্স (বিও) হিসাবের পরিসংখ্যানে। গত এক দশকে দেশের বিও হিসাব প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, যা বাজারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটকে নতুন করে সামনে এনেছে।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর সর্বশেষ তথ্য বলছে, ২০১৬ সালের ১ জুলাই দেশে মোট বিও হিসাব ছিল ৩১ লাখ ৫৩ হাজার। ২০২৫-২৬ অর্থবছর শেষে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৬ লাখ ৭৫ হাজারে। অর্থাৎ মাত্র ১০ বছরে ১৪ লাখ ৭৮ হাজার বিও হিসাব বন্ধ হয়েছে, যা মোট হিসাবের প্রায় ৪৭ শতাংশ। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশেরও কম মানুষের বিও হিসাব রয়েছে। অথচ প্রতিবেশী ভারতে জনসংখ্যার ৯ শতাংশেরও বেশি মানুষ সরাসরি শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন। এই বৈপরীত্য বাংলাদেশের পুঁজি বাজারের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাকেই তুলে ধরে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিও হিসাব কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী মানসম্পন্ন কোম্পানি বাজারে না আসা। গত এক দশকে তালিকাভুক্ত হওয়া অধিকাংশ কোম্পানি বিনিয়োগকারীদের আশানুরূপ রিটার্ন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বরং অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম তালিকাভুক্তির পর ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ফলে নতুন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজার সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়েছে, আর পুরোনো বিনিয়োগকারীদের বড় একটি অংশ লোকসানের অভিজ্ঞতা নিয়ে বাজার থেকে সরে গেছেন।

বাজারসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে শেয়ার বাজারে প্রবেশ করা অধিকাংশ বিনিয়োগকারী গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি মূলধন হারিয়েছেন। অনেক কোম্পানির শেয়ারের দাম অর্ধেকেরও নিচে নেমে গেছে। একই সঙ্গে বিনিয়োগকারী সুরক্ষার দুর্বলতা, করপোরেট সুশাসনের অভাব, কিছু ব্রোকারেজ হাউস ও অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম এবং আর্থিক ক্ষতির ঘটনাও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা বাড়িয়েছে। ফলে বাজারে নতুন অর্থ প্রবাহ কমে গেছে এবং বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ছে।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে অনেক বিনিয়োগকারী শুধুমাত্র আইপিওতে আবেদন করার সুবিধা ধরে রাখতে বিও হিসাব সচল রাখছেন। কিন্তু গত দুই বছরে কোনো প্রতিষ্ঠানই আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করেনি। এর আগেও বাজারে আসা অনেক আইপিও প্রত্যাশিত মানের ছিল না। যদিও বিও হিসাবের রক্ষণাবেক্ষণ ফি কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তবুও নতুন ও শক্তিশালী কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়ায় অনেকেই হিসাব বন্ধ করে দিয়েছেন।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজার ছাড়ার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। ২০১৬ সালে নারী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ছিল ৮ লাখ ৫২ হাজার, যা বর্তমানে কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৯৪ হাজারে। একই সময়ে পুরুষ বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ২২ লাখ ৯০ হাজার থেকে কমে হয়েছে ১২ লাখ ৬৩ হাজার। অন্যদিকে বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের বিও হিসাব ১ লাখ ৫৭ হাজার থেকে কমে মাত্র ৪৩ হাজারে নেমেছে। যৌথ বিও হিসাবও ১১ লাখ ৯০ হাজার থেকে কমে হয়েছে ৪ লাখ ৪২ হাজার, যা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ হ্রাসের সমান। একক বিও হিসাবও ১৯ লাখ ৫৩ হাজার থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১২ লাখ ১৫ হাজারে।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে মোট বিও হিসাবের সংখ্যায় কিছুটা বৃদ্ধি দেখা গেলেও সেটি বাজারে সক্রিয় বিনিয়োগ বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে না। জাতীয় নির্বাচনের পর চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মোট বিও হিসাব ১৬ লাখ ৪১ হাজার থেকে বেড়ে ১৬ লাখ ৭৫ হাজারে পৌঁছেছে। কিন্তু একই সময়ে শেয়ার শূন্য বা নিষ্ক্রিয় বিও হিসাবও ৩ লাখ ৬৮ হাজার থেকে বেড়ে ৩ লাখ ৯৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ নতুন হিসাব খোলা হলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিনিয়োগকারী বাস্তবে কোনো শেয়ার ধারণ করছেন না।

সিডিবিএলের কর্মকর্তারা বলছেন, বছরের শুরুতে বাজারে কিছুটা ইতিবাচক ধারা তৈরি হওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে বাজার থেকে বেরিয়ে গেছেন। পাশাপাশি ডিফল্টার ব্রোকারেজ হাউস থেকে শেয়ার স্থানান্তর, রক্ষণাবেক্ষণ ফি এড়াতে দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয় হিসাব বন্ধ করা এবং বাজারে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত থাকাও বিও হিসাব কমার অন্যতম কারণ। তবে তাদের আশা, ভবিষ্যতে যদি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ কোম্পানির আইপিও আসে, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত হয় এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসে, তাহলে নতুন করে বিও হিসাব খোলার প্রবণতা আবারও বাড়তে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল সূচকের সাময়িক উত্থান দিয়ে পুঁজি বাজারকে টেকসই করা সম্ভব নয়। বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন মানসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি, করপোরেট সুশাসন জোরদার, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর তদারকি। অন্যথায় বিও হিসাবের সংখ্যা কমার এই প্রবণতা দেশের পুঁজি বাজারের দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতার জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা হয়ে থাকবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 20 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version