অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দেশের শেয়ার বাজারে দীর্ঘদিন ধরে চলমান স্থবিরতা ও আস্থার সংকট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে গভীর হতাশা তৈরি করেছে। ফলস্বরূপ, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিনিয়োগকারী ধীরে ধীরে বাজার থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীর অ্যাকাউন্ট কার্যত শূন্য হয়ে গেছে—যা পুঁজি বাজারের জন্য উদ্বেগজনক ইঙ্গিত বহন করছে।

সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর তথ্য বলছে, খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে বিপুল সংখ্যক বেনিফিশিয়ারি ওনার (বিও) অ্যাকাউন্টে আর কোনো শেয়ার অবশিষ্ট নেই। ২০২৫ সালের শেষ দিকে যেখানে শেয়ারবিহীন অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজার, তা ২০২৬ সালের মার্চ নাগাদ বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসেই প্রায় ১৩ হাজার অ্যাকাউন্ট সম্পূর্ণ খালি হয়ে গেছে।

বর্তমানে দেশে প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার সক্রিয় বিও অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এখন আর কোনো বিনিয়োগ বহন করছে না। বিশ্লেষকদের মতে, খুচরা বিনিয়োগকারীদের এই ধারাবাহিক প্রস্থান বাজারের জন্য একটি নেতিবাচক বার্তা দেয়, কারণ তারাই সাধারণত বাজারের প্রাণশক্তি হিসেবে বিবেচিত।

বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিনিয়োগকারীদের এই বিমুখতার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, দীর্ঘ সময় ধরে শেয়ার বাজারে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা না পাওয়ায় অনেকেই লোকসান মেনে নিয়েই শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, নতুন ও মানসম্পন্ন আইপিওর অভাব বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে যারা শুধুমাত্র আইপিওতে অংশ নেওয়ার জন্য বিও অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন, তারা এখন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।

অন্যদিকে, নিরাপদ বিনিয়োগের বিকল্প সুযোগও বাজার থেকে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি ট্রেজারি বন্ডে তুলনামূলক বেশি সুদের হার পাওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী কম ঝুঁকির দিকে ঝুঁকছেন। পাশাপাশি, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, মুদ্রার অবমূল্যায়ন এবং আন্তর্জাতিক অস্থিরতা—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি—বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক করে তুলেছে।

এই প্রেক্ষাপটে বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আইপিওতে আবেদন করার ক্ষেত্রে ন্যূনতম বিনিয়োগের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং বিও অ্যাকাউন্টের বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ ফি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ এখনো প্রত্যাশিত ফল আনতে পারেনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র নীতিগত পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; বাজারে স্থিতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হলে আস্থা ফিরে আসা কঠিন। উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি খাতের অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের মনে অনিশ্চয়তা তৈরি করছে, যা তাদের সিদ্ধান্তে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

সব মিলিয়ে, বর্তমান পরিস্থিতি শেয়ার বাজারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন এবং বাজারে গতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

অকা/পুঁবা/ই/দুপুর/২৯ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 17 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version