অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বাজারে ২০২৫ সালে গড় ইউনিট মূল্য ২০২৪ সালের তুলনায় ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে। আয় বাড়লেও প্রতি ইউনিট পণ্যে আয় কমে যাওয়ায় সামগ্রিকভাবে মূল্যচাপ স্পষ্ট হয়েছে।

বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপে ভোক্তা চাহিদা এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় ফেরেনি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়তি শুল্ক ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক রপ্তানিকারক দেশ বিকল্প বাজার হিসেবে ইউরোপমুখী হয়েছে। ফলে সরবরাহ বেড়ে গিয়ে দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে চীন ও ভারতের মতো বড় রপ্তানিকারকদের আগ্রাসী উপস্থিতি প্রতিযোগিতা আরও তীব্র করেছে।

বাংলাদেশ অ্যাপারেল এক্সচেঞ্জ-এর বিশ্লেষণ করা ইউরোস্ট্যাট-এর তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালে ইইউতে মোট পোশাক আমদানির আর্থিক মূল্য ২ দশমিক ১০ শতাংশ বেড়ে ৯০ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। তবে আমদানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৭৮ শতাংশ বাড়লেও গড় ইউনিট মূল্য কমেছে ১০ দশমিক ২৭ শতাংশ। অর্থাৎ কম দামে বেশি পণ্য আমদানি হয়েছে—যা সরাসরি মূল্যহ্রাসের ইঙ্গিত দেয়।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্রটি আংশিক ইতিবাচক হলেও মূল্যচাপ থেকে মুক্ত নয়। ২০২৪ সালে ইইউতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ছিল ১৮ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ইউরো; ২০২৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯ দশমিক ৪১ বিলিয়ন ইউরোতে—প্রায় ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। কিন্তু রপ্তানির পরিমাণ যে হারে বেড়েছে, আয়ের প্রবৃদ্ধি তার চেয়ে কম হওয়ায় গড় ইউনিট মূল্য ৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ কমেছে। শুধু ডিসেম্বর মাসেই আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দাম কমেছে প্রায় ১২ শতাংশ।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চ শুল্কের কারণে চীন সেখানে রফতানি কমিয়ে ইউরোপে বেশি পণ্য পাঠাচ্ছে। এতে বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হয়েছে। ফলে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশকে কম দামে অর্ডার নিতে হচ্ছে। ইউরোপে চীনের রফতানি ১ দশমিক ১৭ শতাংশ বেড়ে ২৬ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছালেও তাদের গড় ইউনিট মূল্য ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ কমেছে—যা প্রতিযোগিতামূলক মূল্যছাড়ের কৌশলের ইঙ্গিত দেয়।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ইউরোপের কিছু দেশে অর্থনৈতিক চাপ ও ভোক্তা আস্থার ঘাটতি থাকায় চাহিদা শক্তিশালী হয়নি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সীমাবদ্ধতা তৈরি হওয়ায় রফতানিকারক দেশগুলো ইউরোপে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে, যা মূল্য প্রতিযোগিতা বাড়াচ্ছে। স্বল্পমেয়াদে কিছুটা সমন্বয় দেখা গেলেও আগামী দুই-তিন বছরে নতুন চ্যালেঞ্জ আসতে পারে। কারণ ভারত ও ভিয়েতনাম ইইউর সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তির আওতায় ধীরে ধীরে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেতে শুরু করলে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতার চাপ আরও বাড়বে।

ইউরোস্ট্যাটের উপাত্তে আরও দেখা যায়, ভিয়েতনাম ব্যতিক্রম হিসেবে রফতানি ১০ শতাংশ বাড়ানোর পাশাপাশি ইউনিট মূল্য ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ তারা উচ্চমূল্যের পণ্যে অবস্থান শক্ত করেছে, যেখানে অধিকাংশ রফতানিকারক দেশ কম দামে বেশি বিক্রির কৌশলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রফতানির প্রায় অর্ধেকই ইউরোপমুখী। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বৈশ্বিক বাজারে দেশের মোট রফতানি প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। কিন্তু ইউরোপে মূল্যচাপ অব্যাহত থাকলে প্রবৃদ্ধির পরিমাণগত সাফল্য আয় ও মুনাফায় পূর্ণ প্রতিফলন নাও পেতে পারে—এমন আশঙ্কাই এখন শিল্প সংশ্লিষ্টদের বড় উদ্বেগ।

অকা/তৈপোশি/ই/সকাল/১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version