অর্থকাগজ ডেস্ক
বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনায় চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে যে পরিমাণ ঋণ ছাড় হয়েছে, তার প্রায় ৯০ শতাংশই ব্যয় হয়েছে পূর্বে নেওয়া ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধে। একই সঙ্গে নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতি এবং অর্থছাড়—দুই ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) জুলাই-মে সময়ের বৈদেশিক ঋণসংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে বাংলাদেশ বৈদেশিক ঋণ হিসেবে পেয়েছে ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার। বিপরীতে পুরোনো ঋণের সুদ ও আসল বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার। ফলে মোট প্রাপ্ত ঋণের মাত্র ৪৪ কোটি ৪৮ লাখ ৫০ হাজার ডলার নিট হিসাবে অবশিষ্ট রয়েছে। অর্থাৎ ছাড় হওয়া বৈদেশিক ঋণের ৮৯ দশমিক ২৮ শতাংশই ঋণ পরিশোধে চলে গেছে।
নতুন ঋণ প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রেও গতি কমেছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ৪২২ কোটি ৫৩ লাখ ৯০ হাজার ডলারের ঋণ ও সহায়তার প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৬ কোটি ৩২ লাখ ৭০ হাজার ডলার কম। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়ে প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
সবচেয়ে বেশি পতন দেখা গেছে অনুদান প্রতিশ্রুতিতে। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে অনুদান প্রতিশ্রুতি এসেছে মাত্র ১৫ কোটি ৮৭ লাখ ৬০ হাজার ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩৮ কোটি ৯ লাখ ৮০ হাজার ডলার।
ঋণের অর্থছাড়েও উল্লেখযোগ্য সংকোচন ঘটেছে। চলতি অর্থবছরের ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণ ছাড় হয়েছে ৪৫৭ কোটি ৭১ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০৩ কোটি ১০ লাখ ১০ হাজার ডলার কম। গত অর্থবছরের একই সময়ে ছাড় হয়েছিল ৫৬০ কোটি ৮১ লাখ ৬০ হাজার ডলার।
অর্থনীতিবিদদের মতে, গত এক দশকে নেওয়া বড় বড় অবকাঠামো প্রকল্প ও উচ্চমূল্যের বৈদেশিক ঋণের অনেকগুলোর গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে আসায় এখন ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। ফলে নতুন ঋণ আসলেও তার বড় অংশ পুরোনো দায় পরিশোধেই ব্যয় হচ্ছে।
চলতি অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে বৈদেশিক ঋণের সুদ ও আসল মিলিয়ে মোট পরিশোধ হয়েছে ৪১৩ কোটি ২৩ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ৩৭৮ কোটি ৪৬ লাখ ১০ হাজার ডলার। অর্থাৎ এক বছরে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৩৪ কোটি ৭৬ লাখ ৯০ হাজার ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ হাজার ৮৩৯ কোটি ৭৮ লাখ টাকার সমপরিমাণ।
এর মধ্যে সুদ পরিশোধে ব্যয় হয়েছে ১৪৪ কোটি ৭৯ লাখ ৭০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের ১৪০ কোটি ১২ লাখ ৪০ হাজার ডলারের তুলনায় বেশি। অন্যদিকে আসল ঋণ পরিশোধও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে আসল পরিশোধ করা হয়েছে ২৬৮ কোটি ৪৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার, যেখানে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ পরিমাণ ছিল ২৩৮ কোটি ৩৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার।
সার্বিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত করছে, বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরশীল উন্নয়ন অর্থায়নের মডেল এখন নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে নতুন ঋণের প্রবাহ কমছে, অন্যদিকে পুরোনো ঋণ পরিশোধের চাপ দ্রুত বাড়ছে। ফলে বৈদেশিক অর্থায়নের নিট সুবিধা সংকুচিত হচ্ছে, যা ভবিষ্যতে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
সর্বশেষ হালনাগাদ 6 minutes আগে

