অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে এ সরকার শুরু থেকেই বেশ স্বস্তিতে ছিল। রিজার্ভ বাড়িয়ে একের পর এক রেকর্ড করেছে। রিজার্ভ বেশি থাকায় ডলারের বিপরীতে টাকার মানও ধরে রেখেছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আমদানিও বেড়েছে ব্যাপকভাবে।
করোনার ধাক্কাও বৈদেশিক খাতে ভালোভাবেই সামাল দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় সব তছনছ হয়ে হয়ে গেছে। ঋণ নিয়ে বাড়ানো রিজার্ভের স্বস্তি এখন হয়ে গেছে বড় অস্বস্তি। দ্রুত কমে গিয়ে আশঙ্কাজনক অবস্থায় পৌঁছে গেছে। আমদানি ব্যয় মেটাতে সরকার হিমশিম খাচ্ছে।
নতুন এলসি খুলতে ডলারের জোগান একেবারেই কম। ডলারের দাম বেড়ে গিয়ে এর বিপরীতে টাকার মান কমে যাচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে বৈদেশিক দায়দেনা। যা অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে এলোমেলো করে দিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গত কয়েক বছর ধরেই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের চেয়ে ব্যয় বাড়ছে বেশি। ঘাটতি মেটাতে বৈদেশিক মুদ্রায় স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়া হয়েছে। ঋণের অর্থ খরচ করে বৈদেশিক দায় মেটানো এবং রেমিট্যান্স ও রফতনির আয়ের একটি বড় অংশ দিয়ে কৃত্রিমভাবে রিজার্র্ভ বাড়ানো হয়েছে।
ডলারের বিপরীতে টাকার মান ধরে রাখা হয়েছে। সব মিলে ২০২১ সালের জুলাই পর্র্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রা পরিস্থিতি ছিল বেশ স্বস্তিদায়ক। এমন কি করোনার সময় বৈশ্বিক মন্দা দেখা দিলেও দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে। ওই সময়ে রফতনি কমলেও রেমিট্যান্স বেড়েছে। বিপরীতে আমদানি কমেছে।
এছাড়া আমদানি বিল ও ঋণের কিস্তি পরিশোধ ব্যাপকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। এতে একদিকে দায় বেড়েছে, অন্যদিকে বেড়েছে রিজার্ভ। কিন্তু এ দায় যে এক সময় গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াবে সেটা নীতিনির্ধারকরা আমলে নেননি। যে কারণে এখন ডলার সংকট প্রকট। যুদ্ধের ৭ মাস আগে থেকেই ডলার বাজারে চাপ বাড়তে থাকে। যুদ্ধ তা আরও প্রকট করে তোলে।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, ঝুঁকিপূর্ণ স্বল্পমেয়াদি ঋণ নিয়ে রিজার্ভ বাড়ানোর ফলে তা টেকসই হয়নি। যে জন্য সামান্য একটু আঘাতেই ধকল সইতে পারল না। এতে পণ্যের দাম বাড়ছে আকাশছোঁয়া গতিতে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে মূল্যস্ফীতি। এর জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে নিম্ন, মধ্য ও স্বল্প আয়ের মানুষ।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ ২০১৮ সালে ছিল ৮৮১ কোটি ডলার, দায় ছিল ৭৭২ কোটি ডলার। ২০১৯ সালে রিজার্ভ বাড়ায় সম্পদও বেড়ে যায়, একই সঙ্গে বাড়ে দায়। ওই বছরে সম্পদ ছিল ১ হাজার ৪৭৩ কোটি ডলার, দায় ছিল ১৩৮৯ কোটি ডলার।
২০২০ সালে ২০০৯ কোটি ডলারের সম্পদের বিপরীতে দায় ছিল ১ হাজার ৮৪৬ কোটি ডলার। ২০২১ সালে ২ হাজার ৪৩৬ কোটি ডলার সম্পদের বিপরীতে দায় ২ হাজার ২৭৬ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। গত ৪ বছরের ব্যবধানে সম্পদ বেড়েছে ১৭৭ শতাংশ। এর বিপরীতে দায় বেড়েছে ১৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ বৈদেশিক মুদ্রা জমার চেয়ে দেনার পরিমাণ বেড়েছে বেশি।
এ প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন-যুদ্ধ, রাজনৈতিক অস্থিরতা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে যে অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে আসে তা হঠাৎ করেই শুরু হয়। কিন্তু ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণে যে সংকট দেখা দেয়-তা অনেক আগে থেকেই সতর্ক সংকেত দিয়ে আসে।
সেসব সংকট অবহেলা করলে বড় বিপর্যয় দেখা দেয়। যেমনটি হয়েছে শ্রীলংকায়। বাংলাদেশেও একটি সময়ে যে বৈদেশিক মুদ্রার সংকট হবে এটি ৫-৬ বছর আগে থেকেই সংকত পাওয়া গিয়েছিল। চলতি হিসাবে অব্যাহত ঘাটতি, প্রবল বাণিজ্য ঘাটতি, বৈদেশিক সম্পদের চেয়ে দায় বেড়ে যাওয়া। এ বিষয়গুলোতে সতর্ক হলে এখন এত সংকট হতো না।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে যে সংকট সেটি শুধু যুদ্ধের কারণে নয়। যুদ্ধ সংকটকে আড়াল থেকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে। কিন্তু সংকট ভেতরে ভেতরে আগে থেকেই ছিল। এ সংকট মোকাবিলা শুধু ঋণ নিয়ে সম্ভব হবে না। দেশের ভেতরেও উৎপাদন বাড়াতে হবে। আমদানি আরও বেশি কমাতে হবে।
টাকা পাচার বন্ধ করাটা জরুরি। আর বাজার তদারকি বাড়িয়ে পণ্যমূল্য যতটুকু সম্ভব যৌক্তিক পর্যায়ে রাখতে হবে। দেশের ভেতরের চাহিদা বাড়াতে ছোট শিল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান করতে হবে। বড় শিল্পগুলোকে খারাপ হতে দেওয়া যাবে না। রফতনি বাজার নিয়ে বিকল্প চিন্তা করাটা জরুরি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, মোট দায়ের বড় অংশই আমদানির জন্য এলসি বা ঋণপত্র। যা মোট দায়ের ৬১ দশমিক ৭০ শতাংশ। এলসির গ্যারান্টি দেওয়ার কারণে দায় ৮ দশমিক ২৩ শতাংশ। এলসির স্বীকৃতি দিয়ে দায় সৃষ্টি করা হয়েছে ২৯ দশমকি ৯১ শতাংশ এবং অন্যান্য দায় দশমিক ১৬ শতাংশ। এগুলো পরোক্ষ দেনা হলেও নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সরাসরি দায়ে পরিণত হয়।
করোনার পর ২০২১ সালের মাঝামাঝি পর্র্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের মধ্যে থাকলেও পরে তা প্রকাশ্যে আসতে থাকে। বাড়তে থাকে দায়। এলসির নিষ্পত্তি কমে গিয়ে দায় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে করোনার কারণে এলসির দেনা ও বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত করায় দায় আরও বেশি বেড়েছে। ২০১৯ সালে এলসি খোলা ছিল ৫ হাজার ৭০০ কোটি ডলারের, নিষ্পত্তি বা আমদানি হয়েছিল ৫ হাজার ৪৫০ কোটি ডলারের পণ্য।
ওই বছরে অনিষ্পন্ন অবস্থায় ছিল মাত্র ২৫০ কোটি ডলারের এলসি। ২০২০ সালে এলসি খোলা হয় ৫ হাজার ৫৮০ কোটি ডলার, নিষ্পত্তি হয় ৪ হাজার ৬৮০ কোটি ডলার, অনিষ্পন্ন থাকে ৯০০ কোটি ডলার। এক বছরে বৃদ্ধির হার ২৬০ শতাংশ।
অথচ ২০১৯ সালের তুলনায় ২০২০ সালে অনিষ্পন্ন এলসি ৪৩০ কোটি ডলার থেকে ২৫০ কোটি ডলারে নেমে আসে। ২০২১ সালে এলসি খোলা ৮ হাজার ৬২০ কোটি ডলার। নিষ্পত্তি হয় ৭ হাজার ১৬০ কোটি ডলার। অনিষ্পন্ন থাকে ১ হাজার ৪৬০ কোটি ডলার। অনিষ্পন্ন এলসি বৃদ্ধির হার ৬২ দশমিক ২২ শতাংশ। অর্থাৎ দুই বছরের মধ্যে এলসির দায় ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ। বেসরকারি খাতেই এসব ঋণ নেওয়া হয়েছে ৯৫ শতাংশ। এসব ঋণের ক্ষেত্রে দুর্নীতিও হয়েছে। ঋণের টাকা বিনিয়োগ না করে ব্যাংকে আমানত রাখার ঘটনাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদন্তে ধরা পড়েছে। ঋণের বিপরীতে আয় না হওয়ায় একটি অংশ খেলাপি হয়ে পড়ছে। ২০১৭ সালে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ছিল ১ হাজার কোটি ডলার।
২০১৮ ও ২০১৯ সালে তা ৯ হাজারের ঘরে নেমে আসে। ২০২০ সালে সামান্য বেড়ে ১ হাজার কোটি ডলারের উপরে চলে যায়। ২০২১ সালের ডিসেম্বও পর্র্যন্ত তা বেড়ে প্রায় ২ হাজার কোটি ডলার হয়। এক বছরের ব্যবধানে স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ বেড়েছে ১০০ ভাগ। এসব ঋণের কিস্তি এখন শোধ করতে হচ্ছে।
এছাড়া বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এসব ঋণ এখন উদ্যোক্তা ও রাষ্ট্রের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই সময়ে দেশে ঋণের সুদের হার বেশি যুক্তি দেখিয়ে বিদেশ থেকে কম সুদে স্বল্পমেয়াদি ঋণ নেওয়া হয়েছিল। সুদের হার ছিল ৬ শতাংশ। লন্ডন ইন্টার ব্যাংক অফার রেটের (লাইবর) সঙ্গে ৩ বা ৪ শতাংশ যোগ করে সুদ নির্ধারতি হতো।
তখন ৬ মাস মেয়াদি ডলার বন্ডের রেট ছিল দেড় শতাংশ। এর সঙ্গে ৩ বা ৪ যোগ করলে সুদ হতো সাড়ে ৪ থেকে সাড়ে ৫ শতাংশ। সার্ভিস চার্জ মিলিয়ে ৬ শতাংশের মধ্যেই ঋণ পাওয়া গেছে। দেশে তখন সুদের হার ছিল ১৪ থেকে ১৬ শতাংশ। শর্ত ছিল ঋণ পরিশোধের সময় ডলারের যে দর থাকবে সেই দরে পরিশোধ করতে হবে। ডলারের দাম আগে ছিল ৮৪ থেকে ৮৫ টাকা। স্বাভাবিক নিয়মে এর দাম এখন ৮৬ থেকে ৮৭ টাকা হওয়ার কথা।
কিন্তু বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ডলারের দামে বেড়ে ১০৭ টাকায় উঠেছে। এ দামেও ডলার পাওয়া যাচ্ছে না। আগাম কিনতে হলে ১১৫ টাকা দিতে হচ্ছে। তাও মিলছে না। এখন প্রতি ডলার ঋণে বেশি শোধ করতে হবে ২৮ থেকে ২৯ টাকা। লাইবর রেট দেড় শতাংশ থেকে বেড়ে এখন পৌনে ৪ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ সোয়া ২ শতাংশ বেশি সুদ দিতে হবে। এতে উদ্যোক্তাদের অনেক বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হবে। ফলে অনেকেরই ঋণ বিনিয়োগ করে অর্জিত মুনাফার চেয়ে বেশি শোধ করতে হবে।
ডলার বাজারে বিদ্যমান অস্থিরতায় রফতনিকারকরা তাদের ডলার বাজারে ছাড়ছেন কম। সেগুলো নিজেদের আমদানির প্রয়োজনে ব্যবহার করছেন। অথবা রিটেনশন কোটায় (রফতনি আয়ের একটি অংশ বিদেশে জমা রেখে ব্যবসায়িক কাজে খরচ করা) দিচ্ছেন। ২০১৮ ও ২০১৯ সালে ওই হিসাবে প্রতিবছর জমা ছিল ৫০ কোটি ডলার করে। ২০২০ সালে তা বেড়ে ৬০ কোটি ডলার হয়। ২০২১ সালে আরও বেড়ে ৭০ কোটি ডলারে দাঁড়ায়।
ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা বাড়ায় নস্ট্রো অ্যাকাউন্টে (বিদেশে বাংলাদেশি ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রায় খোলা অ্যাকাউন্ট) ২০২০ সালে জমা ছিল ২০ কোটি ডলার। ২০২১ সালে তা কমে ১০ কোটি ডলার হয়।
প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, ২০০২ সাল থেকে রিজার্ভ বাড়ছে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে তা রেকর্ড গড়তে শুরু করে। ওই সময়ে ৩ মাসের বেশি আমদানি ব্যয় মেটানোর রিজার্ভ ছিল। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এলে রিজার্ভ আরও দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে।
যা গত বছরের আগস্ট পর্যন্ত ছিল। ওই সময়ে রিজার্ভ ছিল ৪ হাজার ৮০৮ কোটি ডলার। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৯৪ কোটি ডলারে। নিট হিসাবে তা ৩ হাজার কোটি ডলারের কম। যা দিয়ে ৩ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব। এর আগে এ সরকারের শুরু থেকে ৫ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর রিজার্ভ ছিল।
২০১৭ সালের রিজার্ভ দিয়ে ৬ দশমিক ৩ মাসের, ২০১৮ সালের ৫ দশমিক ২ মাসের, ২০১৯ সালের রিজার্ভ দিয়ে সাড়ে ৫ মাসের, ২০২০ সালে সাড়ে ৫ মাসের এবং ২০২১ সালের রিজার্ভ দিয়ে ৬ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো যেত। ২০২১ আগস্টের রিজার্ভ দিয়ে ৮ মাসের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব ছিল। ২০১০ সালের পর রিজার্ভ দিয়ে এখন সবচেয়ে কম সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো যাবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে, এখনও যে রিজার্ভ আছে তা দিয়ে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যাবে। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া গেলে সংকট কেটে যাবে।
অকা/ব্যাংখা/ দুপুর, ২২ অক্টোবর, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

