অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সাম্প্রতিক সময়ে আমদানিকারকদের জন্য ঋণপত্র বা এলসি নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম কিছুটা বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের তুলনায় বেশি দামে ডলার কিনে তাদের আমদানি বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ডলারবাজারে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি করেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মঙ্গলবার বিভিন্ন শীর্ষ ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যাংকগুলোর আলোচনায় জানা গেছে, এলসি নিষ্পত্তির জন্য ডলারের দর বর্তমানে প্রতি ডলারে প্রায় ১২২ টাকা ৮০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৯০ পয়সার মধ্যে নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর মাত্র একদিন আগেও একই ধরনের লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলারের দর ছিল প্রায় ১২২ টাকা ৫৭ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৭২ পয়সা পর্যন্ত। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে প্রতি ডলারে প্রায় ১৫ থেকে ২০ পয়সা পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

ব্যবসায়ী মহলের কয়েকজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকগুলোতেই মূলত এই বাড়তি দামে এলসি নিষ্পত্তি করা হচ্ছে। তারা জানান, মঙ্গলবার সকালে বিভিন্ন ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ নতুন এই দর জানায়। এর ফলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোকে হঠাৎ করেই অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখে পড়তে হচ্ছে।

উল্লেখ্য, মাত্র এক সপ্তাহ আগেও এলসি নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ডলারের দর ছিল আরও কম। সে সময় প্রতি ডলার প্রায় ১২২ টাকা ৩০ পয়সা থেকে ১২২ টাকা ৩৫ পয়সার মধ্যে লেনদেন হচ্ছিল। অল্প সময়ের মধ্যে এমন ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

বেসরকারি খাতের একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ডলারের দাম হঠাৎ করে বাড়লে আমদানির ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে আমদানি করা পণ্যের দামও বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত দেশের বাজারে ভোগ্যপণ্যের মূল্যেও পড়তে পারে। তিনি আরও বলেন, ডলারবাজার অস্থিতিশীল হয়ে পড়লে তা দ্রুতই একটি বড় অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।

অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের কর্মকর্তারাও পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একটি বেসরকারি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, গত প্রায় দেড় বছরের বেশি সময় ধরে ডলারবাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল। এ সময়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়নি এবং লেনদেনও স্বাভাবিকভাবেই চলছিল। তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এখনই যথাযথ নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে তিনি মনে করেন।

তিনি আরও জানান, সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক-এর গভর্নরের সঙ্গে অর্থনীতিবিদদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধরে রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর অর্থ হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভবিষ্যতে ডলার বিক্রি করে বাজারে সরাসরি হস্তক্ষেপ কম করতে পারে।

এই বার্তা বাজারে পৌঁছানোর পর ব্যাংকগুলো নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে শুরু করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে আমদানি ব্যয় বাড়লেও ব্যাংকগুলোকে মূলত নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়েই সেই চাহিদা পূরণ করতে হতে পারে। এজন্য অনেক ব্যাংক এখন আগের তুলনায় বেশি রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় কিনে নিজেদের রিজার্ভে ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

ব্যাংকিং খাতের আরেকজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, এতদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক দক্ষতার সঙ্গে ডলারবাজারকে তুলনামূলক স্থিতিশীল রাখতে পেরেছে। তবে ডলারবাজার অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি ক্ষেত্র; এখানে সামান্য অস্থিরতাও দ্রুত অন্যান্য অর্থনৈতিক খাতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বাজার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ডলারবাজার স্থিতিশীল রাখা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। কারণ আমদানি ব্যয়, শিল্প উৎপাদন, পণ্যের দাম এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়—সবকিছুই শেষ পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার বাজারের ওপর নির্ভর করে। তাই ডলারবাজারে অতিরিক্ত অস্থিরতা দেখা দিলে তা দ্রুতই পুরো অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।

অকা/ব্যাংখা/ই/দুপুর/১১ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version