অর্থকাগজ প্রতিবেদন

ব্যবসায়ী ও সাধারণ করদাতাদের ওপর করের চাপ কিছুটা কমাতে একগুচ্ছ নীতিগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। জাতীয় সংসদে অর্থবিল পাসের সময় এসব সংশোধনী যুক্ত হতে পারে বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এসব পরিবর্তন কার্যকর হলে সোনা বিক্রির মুনাফার ওপর করহার কমানো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর হ্রাস, প্লাস্টিক শিল্পের কাঁচামালে আমদানি শুল্কে ছাড়, অনলাইন বিজ্ঞাপনের ভ্যাট কমানো এবং ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট পরিশোধের সময়সীমা সহজ করার মতো একাধিক উদ্যোগ বাস্তবায়িত হতে পারে।

সূত্র জানায়, সোনা বিক্রির ক্ষেত্রে ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার বিষয়ে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত আসতে পারে। একই সঙ্গে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর বিদ্যমান ১০ শতাংশ কর অর্ধেকে নামিয়ে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

এছাড়া প্লাস্টিক শিল্পের দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল—পিভিসি (PVC) রেজিন ও পিইটি (PET) রেজিন আমদানির ওপর সম্প্রতি বাড়ানো শুল্ক প্রত্যাহার করে আগের হারে ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা রয়েছে। পাইপ, পানির ট্যাংক, প্যাকেজিং, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক পণ্য, যানবাহনের যন্ত্রাংশ, পানীয়ের বোতল এবং ওষুধের মোড়ক তৈরিতে এসব কাঁচামালের ব্যাপক ব্যবহার হওয়ায় শিল্প উদ্যোক্তারা দীর্ঘদিন ধরে শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাদের মতে, বাড়তি শুল্ক উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিচ্ছিল।

ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহ দিতে অনলাইন বিজ্ঞাপনের ওপর বিদ্যমান ১৫ শতাংশ ভ্যাট কমিয়ে ৫ শতাংশ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, বাংলাদেশে ভ্যাটের হার তুলনামূলক বেশি হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠান সিঙ্গাপুর বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশের মাধ্যমে বিজ্ঞাপনের বিল পরিশোধ করে থাকে। ফলে দেশীয় রাজস্ব আহরণ বাধাগ্রস্ত হয়। করহার কমানো হলে বিদেশে বিল স্থানান্তরের প্রবণতা কমে রাজস্ব আদায় বাড়তে পারে বলে সরকারের ধারণা।

ব্যবসায়ীদের জন্য ভ্যাট ব্যবস্থাপনাও সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ভ্যাট পরিশোধের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা পরিবর্তন করে তিন মাস অন্তর ভ্যাট জমা দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি তামাক কোম্পানির সম্পূরক শুল্কেও কিছু বিশেষ সমন্বয় আনার আলোচনা রয়েছে।

ব্যক্তি করদাতাদের জন্যও করমুক্ত আয়ের সীমা ধাপে ধাপে বাড়ানোর প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, আগামী দুই করবর্ষে করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা, পরবর্তী দুই বছরে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে তা ৫ লাখ টাকায় উন্নীত হতে পারে।

এনবিআরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, প্রস্তাবিত বাজেটের কিছু কর ব্যবস্থা ব্যবসায়ী ও করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে—এমন মূল্যায়নের পর সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কয়েকটি ক্ষেত্রে করহার কমানো ও বিধান সহজ করার নির্দেশনা এসেছে। তবে এসব ছাড় কার্যকর হলে সরকারের রাজস্ব আহরণে কিছুটা প্রভাব পড়তে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

সোনা বিক্রির ওপর কর আরোপের প্রস্তাব ঘোষণার পর থেকেই বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এতদিন কর রিটার্নে উল্লেখ করা স্বর্ণ বিক্রির ক্ষেত্রে কার্যত কোনো কর দিতে হতো না। এবার বাজেটে ক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে অবশিষ্ট মুনাফাকে ক্যাপিটাল গেইনস হিসেবে গণ্য করে তার ওপর ১৫ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। বিভিন্ন মহলের আপত্তির পর সেই হার কমিয়ে ৫ শতাংশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে আবাসন খাতে বিনা প্রশ্নে অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ থেকেও সরে আসছে সরকার। বাজেট প্রস্তাবে এমন একটি বিধান ছিল, যাতে জমি বা ফ্ল্যাট ক্রয়ের ক্ষেত্রে দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি অর্থ দেখানো হলেও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সেই অতিরিক্ত অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন করতে পারবে না। সমালোচকদের মতে, এতে অবৈধ অর্থ বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি হতো। এ কারণে প্রস্তাবটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

এই বিধান বাতিল হলে আগের নিয়মই বহাল থাকবে। অর্থাৎ, অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগ করতে হলে প্রযোজ্য করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১০ শতাংশ জরিমানা দিতে হবে এবং বিনিয়োগকারীরা কোনো ধরনের দায়মুক্তি পাবেন না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ওই অর্থের উৎস সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ বা তদন্ত করতে পারবে। ফলে আবাসন খাতে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ কার্যত আরও সীমিত হয়ে যাবে।

সব মিলিয়ে অর্থবিলে প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যয় কমানো, কর ব্যবস্থাকে আরও বাস্তবসম্মত করা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি আনার লক্ষ্যেই আনা হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। তবে কর ছাড়ের ফলে স্বল্পমেয়াদে সরকারের রাজস্ব আহরণে কিছুটা চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

সর্বশেষ হালনাগাদ 18 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version