অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
২০২৫ সালে বাংলাদেশের সড়কপথ যেন এক দীর্ঘ শোকগাথা হয়ে উঠেছিল। বছরজুড়ে ৬ হাজার ৭২৯টি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৯ হাজার ১১১ জন, আহত হয়েছেন আরও ১৪ হাজার ৮১২ জন। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়—প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে পরিবার হারানো উপার্জনক্ষম সদস্য, স্থায়ী পঙ্গুত্বে নিঃস্ব হওয়া মানুষ এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ব্যয়ের বোঝা। সড়ক নিরাপত্তা যখন জাতীয় সংকটে রূপ নিয়েছে, তখন ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সুরক্ষায় কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ‘থার্ড পার্টি বীমা’ বা মোটর লায়াবিলিটি বীমা প্রায় অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
নীতিগত প্রত্যাবর্তন, কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে স্থবিরতা
বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) ২০২৫ সালের আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে ‘মোটর লায়াবিলিটি ইন্স্যুরেন্স’ পুনরায় চালু করে। উদ্দেশ্য ছিল—যে যানবাহনের কারণে তৃতীয় পক্ষের মৃত্যু, আঘাত বা সম্পত্তির ক্ষতি হবে, সেই ক্ষতির আর্থিক দায় বীমা কোম্পানি বহন করবে। কিন্তু ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও গ্রাহকসংখ্যা কার্যত শূন্যের কোটায়। অর্থাৎ নীতি প্রণয়ন হয়েছে, কিন্তু বাজারে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়নি।
২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর হওয়ার পর ২০২০ সালে থার্ড পার্টি বীমার বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়। ফলাফল ছিল পূর্বানুমেয়—আইনি চাপ না থাকলে স্বেচ্ছায় ঝুঁকি কভারেজ নেওয়ার প্রবণতা বাংলাদেশে অত্যন্ত কম। এই নীতিগত শূন্যতাই খাতটিকে প্রায় স্থবির করে দেয়।
পলিসির কাঠামো - সুরক্ষা সীমিত, প্রত্যাশা বড়
বর্তমান কাঠামো অনুযায়ী—
-
মৃত্যু হলে সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ
-
গুরুতর আহত কিন্তু সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে ২০ হাজার টাকা
-
সম্পত্তির ক্ষতিতে ৬০ হাজার টাকা
-
আইনি ব্যয়ে ১০ হাজার টাকা
প্রশ্ন হলো এই অঙ্কগুলো কি বর্তমান চিকিৎসা ব্যয়, আদালত প্রক্রিয়া এবং পারিবারিক আর্থিক ক্ষতির তুলনায় বাস্তবসম্মত? একটি গুরুতর দুর্ঘটনায় আইসিইউ, সার্জারি ও পুনর্বাসন মিলিয়ে ব্যয় সহজেই কয়েক লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়। সেখানে ২০ হাজার টাকার সীমা কার্যত প্রতীকী সহায়তা মাত্র। অর্থাৎ পলিসি আছে, কিন্তু কভারেজ বাস্তব ঝুঁকির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
গ্রাহকের অনাগ্রহ - আচরণগত ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ
মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত গাড়ির মালিকদের মধ্যে সচেতনতা কম—এটা আংশিক সত্য। কিন্তু আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, এটি আচরণগত অর্থনীতির একটি ক্লাসিক উদাহরণ। মানুষ সাধারণত কম সম্ভাবনাময় কিন্তু উচ্চ ক্ষতির ঝুঁকিকে অবমূল্যায়ন করে। “আমি সাবধানে চালাই, আমার কিছু হবে না”—এই মানসিকতা প্রিমিয়াম প্রদানে অনীহা তৈরি করে।
বর্তমান প্রিমিয়াম কাঠামোও বিতর্কের বিষয় -
-
১৫০ সিসি মোটরসাইকেল: ১,০০৬ টাকা
-
১,৩০০ সিসি প্রাইভেট কার: ২,০৭০ টাকা
বাংলাদেশের গড় আয়ের প্রেক্ষাপটে এই অঙ্ক অনেকের কাছে বাড়তি ব্যয় মনে হয়, বিশেষত যখন এটি বাধ্যতামূলক নয় এবং ক্ষতিপূরণের সীমা তুলনামূলক কম।
বীমা কোম্পানির দৃষ্টিকোণ - প্রণোদনা নেই, চাহিদা নেই
বড় বড় অনেক প্রতিষ্ঠান জানিয়েছে, বছরের প্রথম নয় মাসে তারা উল্লেখযোগ্য প্রিমিয়াম সংগ্রহ করলেও মোটর বীমা খাত থেকে আয় শূন্য। কারণ, আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকলে কেউ স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে না। তাছাড়া দাবি নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া জটিল, দীর্ঘসূত্রতা ও আইনি অনিশ্চয়তায় ভরা। ফলে গ্রাহকের চোখে এটি “ঝামেলাপূর্ণ কাগুজে নিরাপত্তা”—বাস্তব সুরক্ষা নয়।
কাঠামোগত সমস্যার মূল কারণ
১. আইনি বাধ্যবাধকতার অভাব – বাধ্যতামূলক না হলে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না।
২. অপর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ সীমা – বাস্তব ক্ষতির তুলনায় অঙ্ক কম।
৩. দাবি নিষ্পত্তির জটিলতা – ডিজিটাল প্রক্রিয়া না থাকায় আস্থাহীনতা বাড়ে।
৪. বাজারে আস্থার সংকট – বীমা খাত নিয়ে দীর্ঘদিনের নেতিবাচক ধারণা এখনো কাটেনি।
আইডিআরএ ইতোমধ্যে বিআরটিএ ও পরিবহন মালিক সমিতির সঙ্গে আলোচনা চালালেও ঐকমত্যে পৌঁছানো যায়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সড়ক দুর্ঘটনার ক্রমবর্ধমান মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বিবেচনায় মোটর লায়াবিলিটি বীমাকে ঐচ্ছিক রেখে কার্যকর ফল পাওয়া কঠিন।
সময়ের দাবি - নীতিগত পুনর্গঠন
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই সমাধানের জন্য প্রয়োজন—
-
বীমাকে পুনরায় আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক করা
-
ক্ষতিপূরণের সীমা বর্তমান ব্যয় কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা
-
দাবি আদায়ের সম্পূর্ণ ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা
-
বিআরটিএ রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস নবায়নের সঙ্গে বীমা যাচাই একীভূত করা
অন্যথায়, থার্ড পার্টি মোটর বীমা কেবল নীতিপত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে—দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হাজারো পরিবারের জন্য তা বাস্তব আর্থিক সুরক্ষা হয়ে উঠবে না। ●
অকা/বীখা/ই/সকাল/১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 days আগে

