অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের স্বর্ণবাজারে আবারও দামের পরিবর্তন এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ার প্রভাবে বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) নতুন করে স্বর্ণের দাম কমিয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ভরি প্রতি ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমেছে। তবে প্রশ্ন হলো, এই মূল্যহ্রাস কি স্বর্ণের বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত, নাকি এটি কেবল সাময়িক সমন্বয়? বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি দ্বিতীয়টিকেই বেশি ইঙ্গিত করছে।
নতুন মূল্য অনুযায়ী, ভ্যাটসহ প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ টাকা। ২১ ক্যারেটের প্রতি ভরি ২ লাখ ৯ হাজার ৮৯৪ টাকা, ১৮ ক্যারেটের ১ লাখ ৮০ হাজার ২৬৭ টাকা এবং সনাতন পদ্ধতির স্বর্ণের দাম ১ লাখ ৪৭ হাজার ৩১৬ টাকা। বাজুস জানিয়েছে, পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এই দাম কার্যকর থাকবে। তবে অলঙ্কারের নকশা ও কারিগরি মজুরি আলাদাভাবে যুক্ত হবে।
মাত্র তিন দিন আগেও, গত ১৩ জুলাই, ভরি প্রতি ২ হাজার ২১৬ টাকা কমিয়ে ২২ ক্যারেট স্বর্ণের দাম ২ লাখ ২১ হাজার ৯৬৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে পরপর দুই দফা মূল্যহ্রাস ঘটলেও বাজার এখনও ইতিহাসের অন্যতম উচ্চ মূল্যস্তরে অবস্থান করছে।
স্বর্ণের দামের এই ওঠানামার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম, মার্কিন ডলারের বিনিময় হার, বৈশ্বিক সুদের হার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর স্বর্ণ ক্রয়, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের মূল্য—সবকিছু মিলিয়েই দেশের বাজারে দাম নির্ধারিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা এবং ডলারের তুলনামূলক শক্তিশালী অবস্থানের কারণে স্বর্ণের দামে কিছুটা সংশোধন এসেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় বাজারে তেজাবি স্বর্ণের দাম কমে যাওয়ায় বাজুসও মূল্য কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
চলতি বছরে স্বর্ণের বাজারে অস্বাভাবিক মাত্রায় অস্থিরতা দেখা গেছে। এখন পর্যন্ত ৯১ বার স্বর্ণের দাম সমন্বয় করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪৪ বার দাম বেড়েছে, ৪৬ বার কমেছে এবং একবার ভ্যাট সমন্বয় করা হয়েছে। এত ঘন ঘন মূল্য পরিবর্তন থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিটি পরিবর্তনের প্রতিফলন এখন দ্রুত দেশের বাজারেও পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মূল্যহ্রাসকে বড় ধরনের পতনের সূচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং দীর্ঘ সময় ধরে ঊর্ধ্বমুখী থাকা বাজারে এটি একটি স্বাভাবিক সংশোধন। কারণ, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এখনও অনিশ্চয়তা পুরোপুরি কাটেনি। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এখনও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কিনছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের চাহিদাকে শক্তিশালী রাখছে। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং আর্থিক বাজারের অস্থিরতা দেখা দিলেই নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণের চাহিদা বেড়ে যায়।
আগামী কয়েক মাসে স্বর্ণের বাজার কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত, ডলারের গতিপ্রকৃতি, বৈশ্বিক মুদ্রাস্ফীতির প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর। যদি সুদের হার কমানোর পরিবেশ তৈরি হয় বা বিশ্বে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দেয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হতে পারে। তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের বাজারেও। বিপরীতে, ডলার আরও শক্তিশালী হলে কিংবা বিশ্ব অর্থনীতি স্থিতিশীল থাকলে কিছু সময়ের জন্য স্বর্ণের দামে সীমিত সংশোধন অব্যাহত থাকতে পারে।
দেশের বাজারেও আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—তেজাবি স্বর্ণের সরবরাহ ও মূল্য। স্থানীয় বাজারে এটির দামের পরিবর্তন এখন বাজুসের মূল্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পরিবর্তন না ঘটলেও স্থানীয় পরিস্থিতির কারণে মাঝেমধ্যেই দামের সমন্বয় হতে পারে।
ক্রেতাদের জন্য বর্তমান মূল্যহ্রাস কিছুটা স্বস্তির হলেও বাস্তবতা হলো, স্বর্ণ এখনও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার তুলনায় অনেক ব্যয়বহুল। ফলে বিয়ে বা প্রয়োজনীয় অলঙ্কার কেনার ক্ষেত্রে সামান্য সুবিধা মিললেও বিনিয়োগের দৃষ্টিকোণ থেকে বাজার এখনও সতর্ক পর্যবেক্ষণের দাবি রাখে।
সব মিলিয়ে, সাম্প্রতিক মূল্যহ্রাস স্বর্ণের বাজারে নতুন প্রবণতার সূচনা নয়; বরং উচ্চমূল্যের ধারার মধ্যেই একটি স্বাভাবিক সমন্বয়। যতদিন বৈশ্বিক অর্থনীতি, সুদের হার এবং ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকবে, ততদিন স্বর্ণ নিরাপদ সম্পদ হিসেবে তার আকর্ষণ ধরে রাখবে। তাই আগামী দিনগুলোতেও বাজারে মূল্য ওঠানামা অব্যাহত থাকার সম্ভাবনাই বেশি, যদিও দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের মূল্য উচ্চ পর্যায়েই থাকার পূর্বাভাস দিচ্ছেন অর্থনীতি ও পণ্যবাজার বিশ্লেষকেরা।
সর্বশেষ হালনাগাদ 20 hours আগে

