অর্থকাগজ প্রতিবেদন
যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণের (নন-পারফর্মিং লোন-এনপিএল) বোঝা এখন বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে। দেশের মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে পুনঃতফসিল করা ঋণ ও বিশেষ নজরদারিতে থাকা হিসাব (স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টস) যোগ করলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ মোট ঋণের ৬০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্থিতিশীলতা, নতুন ঋণ বিতরণ এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর বাড়ছে উদ্বেগ।
বিশ্বব্যাপী খেলাপি ঋণের সর্বশেষ চিত্রে দেখা যায়, ৩৭ দশমিক ৩৫ শতাংশ খেলাপি ঋণের হার নিয়ে শীর্ষে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেন। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতি ও ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যে ধস নেমেছে, তার প্রতিফলন ঘটেছে এই সূচকে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ, যেখানে খেলাপি ঋণের হার ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এরপর রয়েছে চাদ (৩১ দশমিক ৫১ শতাংশ) এবং গিনি (৩১ দশমিক ১৫ শতাংশ)।
সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ কমানোর কৌশল নিয়ে আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। সেখানে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন এবং বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ বিভাগের সচিব।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়ে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ফলে দেশের ব্যাংকিং খাতের আর্থিক স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সার্কে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে বাংলাদেশ
দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থার (সার্ক) সদস্য দেশগুলোর মধ্যে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশে। প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের হার প্রায় ৬ থেকে ১৫ গুণ বেশি।
ভারতে খেলাপি ঋণের হার মাত্র ২ দশমিক ২ শতাংশ। ভুটানে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, মালদ্বীপে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ, নেপালে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ, পাকিস্তানে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তুলনামূলক এই চিত্র স্পষ্টভাবে দেখায় যে, আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
মোট ঋণের ৬১ শতাংশই ঝুঁকির মধ্যে
সরকারি উপস্থাপনায় দেখা গেছে, দেশের ব্যাংক খাতে বর্তমানে মোট ঋণের স্থিতি প্রায় ১৮ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫ লাখ ৮৯ হাজার কোটি টাকা ইতোমধ্যে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে।
তবে প্রকৃত ঝুঁকি আরও বড়। কারণ খেলাপি ঋণের পাশাপাশি পুনঃতফসিল করা ঋণ এবং স্পেশাল মেনশন অ্যাকাউন্টস যুক্ত করলে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৬১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকের ব্যালান্স শিটে থাকা প্রতি ১০০ টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৬১ টাকাই কোনো না কোনো ধরনের ঝুঁকির আওতায় রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু খেলাপি ঋণের সমস্যা নয়; বরং ভবিষ্যতে আরও বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপিতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কারও ইঙ্গিত।
কেন বাড়ছে খেলাপি ঋণ
ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব, সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে ঋণ অনুমোদন, দুর্বল নিয়ন্ত্রক তদারকি, করপোরেট সুশাসনের অভাব এবং দীর্ঘসূত্রতাপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যবসায়িক সক্ষমতা যাচাই না করেই প্রভাবশালী গ্রাহকদের বড় অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। ফলে ঋণ আদায়ের পরিবর্তে বারবার পুনঃতফসিল, পুনর্গঠন কিংবা বিশেষ সুবিধা দেওয়ার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণাও একই চিত্র তুলে ধরেছে। হার্ভার্ড কেনেডি স্কুল ও সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্টের গবেষণায় দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, তথ্যের অসমতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবকে বাংলাদেশের ঋণ পরিবেশের অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূলধনেও বড় সংকট
খেলাপি ঋণের চাপ শুধু ঋণ আদায়েই সীমাবদ্ধ নেই; এটি ব্যাংকগুলোর মূলধন সক্ষমতাকেও দুর্বল করে ফেলছে।
২০২৫ সালের শেষে দেশের ব্যাংক খাতের মূলধন থেকে ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের অনুপাত (সিআরএআর) নেমে এসেছে ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে। এক বছর আগে এই হার ছিল ৩ দশমিক ০৮ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংকের ন্যূনতম সিআরএআর ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু সর্বশেষ হিসাবে ১৯টি ব্যাংক এই ন্যূনতম মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়। পাকিস্তানে সিআরএআর ২০ দশমিক ৮ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ১৯ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ভারতে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিবেশী দেশগুলো তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী মূলধন ভিত্তি ধরে রাখতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশে পরিস্থিতি উল্টো দিকে যাচ্ছে।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়ছে
খেলাপি ঋণ বাড়ার ফলে ব্যাংকগুলোকে বিপুল পরিমাণ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হচ্ছে। একই সঙ্গে বাড়ছে মামলা পরিচালনার ব্যয়, কমছে মুনাফা এবং সংকুচিত হচ্ছে নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিল্প, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে। কারণ ব্যাংকের সম্পদের মান দুর্বল হলে নতুন উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন কমে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেও বাধাগ্রস্ত করে।
যেসব দেশ নিয়ন্ত্রণে সফল
বিশ্বের কয়েকটি দেশ শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো, কঠোর ঋণ মূল্যায়ন এবং কার্যকর আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে খেলাপি ঋণ অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের সর্বনিম্ন খেলাপি ঋণের হার তাইওয়ানে, মাত্র শূন্য দশমিক ১ শতাংশ। বেলজিয়াম, সুইডেন ও এস্তোনিয়ায় এ হার শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ। নরওয়েতে ০ দশমিক ৪ শতাংশ এবং কানাডায় ০ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বচ্ছ ঋণ অনুমোদন ব্যবস্থা, শক্তিশালী তদারকি এবং দ্রুত আইনি নিষ্পত্তির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব—এসব দেশের অভিজ্ঞতা সেটিই প্রমাণ করে।
কাঠামোগত সংস্কারের বিকল্প নেই
এনআরবিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকগুলোর মূলধন সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হলেও বাংলাদেশে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিপরীত।
তার ভাষায়, নিয়ন্ত্রণহীন খেলাপি ঋণ এবং ধারাবাহিক প্রভিশন ঘাটতির কারণে পুরো ব্যাংক খাতের মূলধন ভিত্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে সাময়িক সুবিধা নয়, প্রয়োজন গভীর কাঠামোগত সংস্কার।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর মহাপরিচালক মো. এজাজুল ইসলাম বলেন, ২০২৫ সাল থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র প্রকাশ শুরু করেছে। একই সময়ে ঋণ শ্রেণীকরণের সময়সীমা ছয় মাস থেকে তিন মাসে নামিয়ে আনা এবং পুনঃতফসিল নীতির পরিবর্তনের কারণেও খেলাপি ঋণের পরিমাণ দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে।
১৮ মাসের সংস্কার পরিকল্পনা
ব্যাংক খাতকে স্থিতিশীল করতে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৮ মাসের একটি সংস্কার রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। এর অন্যতম লক্ষ্য আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মানদণ্ড (আইএফআরএস-৯) অনুযায়ী বিদ্যমান নিয়মভিত্তিক প্রভিশনিং ব্যবস্থা থেকে এক্সপেক্টেড ক্রেডিট লস (ইসিএল) পদ্ধতিতে রূপান্তর। ২০২৭ সাল থেকে এটি পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পদ্ধতিতে ঋণ খেলাপি হওয়ার পর নয়, সম্ভাব্য ক্ষতির পূর্বাভাসের ভিত্তিতেই আগাম প্রভিশন সংরক্ষণ করা হবে, যা ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে আরও বাস্তবসম্মত করবে।
এ ছাড়া সরকার ছয় মাসের মধ্যে ঋণসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্য নিয়ে নতুন ঋণ আদালত আইন প্রণয়ন এবং খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেছেন, ভবিষ্যতে ব্যাংকগুলোকে তাদের ব্যালান্স শিটে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ দীর্ঘদিন ধরে বহন না করে তার একটি অংশ অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এতে বারবার ঋণ পুনঃতফসিলের সংস্কৃতি কমবে এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, খেলাপি ঋণ এখন শুধু ব্যাংক খাতের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে। তাই কেবল নতুন নীতি ঘোষণা নয়, ঋণ অনুমোদন থেকে আদায় পর্যন্ত পুরো ব্যবস্থায় সুশাসন, জবাবদিহি ও কার্যকর আইনি প্রয়োগ নিশ্চিত করাই হবে সংকট উত্তরণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

