তারেক আবেদীন

সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনুপম প্রকাশনীর স্বত্বাধিকারী প্রকাশক, লেখক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মিলন নাথ বলেছেন, প্রকাশনা শিল্পে উন্নয়ন যতটা আমরা আশা করেছিলাম, কাঙ্ক্ষিত সে প্রত্যাশা আজও অর্জিত হয়নি। দীর্ঘদিন সরকারের কাছে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা গ্রন্থ নীতি কাজ না করা এর বড় কারণ! নীতিটি প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন হলে আমাদের প্রকাশনা শিল্প এগিয়ে যেত।

বাঙ্গালি জাতীয়তাবাদ, ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ের ওপর সহস্রাধিক গ্রন্থ নিয়ে সুদীর্ঘ সাড়ে চার দশকের সৃজনশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অনুপম প্রকাশনীর প্রধান মিলন নাথ অর্থকাগজ এর প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এ কথা জানান। অমর একুশে গ্রন্থ মেলা ২০২৩ উপলক্ষে আয়োজিত বই মেলায় ক’দিন আগে এক বিকেলে বিভিন্ন আলাপে অর্থকাগজ এর মুখোমুখি হন তিনি। মেলায় তিনি তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে বসে বলেন, ২০ বছর আগে দেশে জাতীয় একটি গ্রন্থনীতি প্রণয়নের লক্ষে আমরা ক’জন সৃজনশীল প্রকাশক ব্যবসায়িও সরকারের উচ্চস্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করি। বেশ কয়েকটি সভা হয় আমাদের। গ্রন্থ নীতিমালার খসড়াও তৈরি করা হয়। আমি মনে করি তা ছিল উপমহাদেশের সেরা গ্রন্থ নীতি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, আজও সে নীতিমালা আলোর মুখ দেখেনি। আমাদের চিৎকার কে শোনে?

একান্ন বছর আগে কলকাতা থেকে আনা ৩২টি বই নিয়ে দেশে মেলার প্রথম উদ্যোক্তা মুক্তধারা এর প্রধান প্রয়াত চিত্তরঞ্জন সাহা পথ অনুসরণ করে বাঙ্গালি শোকের মাসে যে মেলাকে উৎসবে আজ পরিণত করেছে, তাতে আমাদের মান বাড়েনি খুব একটা। পৃথিবীর দীর্ঘ সময়ের সর্ববৃহৎ বই মেলায় আমরা যা দেখছি; তা খুব একটা ভালো, তা বলব না। বই হলেই হবে না! সুসম্পাদনা ও দৃষ্টিনন্দন এবং শিল্পসম্মতভাবে বই বের করা প্রকাশকের বড় দায়িত্ব। লেখকেরও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে।

শীত বিকেলের মনোরম ও আরামপ্রদ রোদে শিশুমনস্ক সংগঠক খেলাঘর এর সাবেক সদস্য মিলন নাথ বলেন, বহু বছর ধরে কাজ করছি। প্রকাশক হিসেবে ৪৫ বছরের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা বৃথা যায়নি। হাজারের ওপরে অনুপম প্রকাশনীর প্রকাশিত গ্রন্থ। লেখকদের কাছ থেকে ভালো পাণ্ডুলিপি পেয়েছি বলেই আমি আপনাদের প্রকাশক পরিচয় দিতে পারছি। অনুপম প্রকাশনীর লেখকরা আমদের ‍ঋদ্ধ করেছেন বলেই আমরা টিকে আছি। পাঠকদের সামনে দাঁড়িয়ে আছি।

লেখক প্রকাশকের পিছনে ছুটছেন এবং বাণিজ্যিকভাবে বেরুচ্ছে বই উল্লেখিত প্রশ্নের উত্তরে তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, লেখক কেন ছুটবেন প্রকাশকের পিছনে? লেখকের কাজ হলো ভালো সৃজনটি সম্পর্কে প্রকাশককে জানানো। আর প্রকাশকের দায়িত্ব হলো বাস্তবসম্মত ও সমসময়িক পটভূমির প্রেক্ষাপটে পাঠকের চাহিদানুযায়ী লেখকের সৃজনশীলতাকে তার কাছে উপস্থাপন করা। সত্যিকারের লেখকের কাছে প্রকাশক যাবেন এটাই সত্য। প্রকাশক বাণিজ্যিক হলে অসুবিধা কোথায়?

দেশে প্রকাশিত গ্রন্থের মান সম্পর্কে প্রকাশক মিলন নাথ বলেন, জাতির মনন ও উৎকর্ষের প্রতীক বলে দাবিকৃত সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি ভালো লেখক তৈরির ক্ষেত্রে আদৌ কোন অবদান রেখেছে? তারা এক সময় লেখক প্রশিক্ষণ দিত! প্রশিক্ষণ দিয়ে কি লেখক তৈরি করা যায়? লেখাটা সম্পূর্ণ মানুষের গভীর মননজাত। তা মেধা ও মননের সুক্ষতম নানন্দিক বিকাশ। আবার জোর করে লেখক হওয়াও যায় না!

দেশে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র নামে সরকারি আরেকটি প্রতিষ্ঠান আছে। এখানে শক্তিমান লেখক, আমলা ও বড় বড় কর্মকর্তারা নিয়োজিত থাকেন। আমরা প্রকাশকরা ওনাদের কাছে টাকা পয়সা চাই না। যা প্রয়োজন তা হলো, আমাদের কাজের সহযোগিতা। প্রতিষ্ঠানটির উচিত বছরে কমপক্ষে ২০ সাহিত্য  সম্পাদক, সংশোধক এবং গ্রন্থ পাণ্ডুলিপির কৌশল তৈরির ব্যক্তি গড়ে তোলা। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের দায়িত্ব হলো প্রকাশনা শিল্পের উন্নয়নে পরিচর্যা করা। তারা কি করছে? সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি আমাদের প্রকাশক ও লেখকদের অগ্রাধিকার দিয়ে এ ব্যাপারে পৃষ্ঠপোষকতা করে যেত; তা হলে প্রকাশনা শিল্পের মান নিয়ে এত প্রশ্ন উঠতো না। প্রকাশকদের যুক্ত করে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো যদি দায়িত্ব পালন করতো, তাহলে এ শিল্প তরতর করে এগিয়ে যেত। তারপরও বলবো, প্রকাশকদের একক প্রচেষ্টায় প্রকাশনা খাতে অনেকটা অগ্রগতি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে নেপথ্যে থাকা কিছু বিদগ্ধ লেখকের পৃষ্ঠপোষকতা ও অবদান অস্বীকার করতে পারি না আমরা।

পেশা হিসেবে সাহিত্য! এ ব্যাপারে তিনি বলেন, হুমায়ূন আহমেদ শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন তা বড় দৃষ্টান্ত। লেখক নির্ধারণ করবেন সাহিত্য পেশা কিনা! তবে লেখকের সম্মানী নির্ভর করে প্রকাশক ও লেখকের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর।

অকা/সা/ সন্ধ্যা, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ

আলোকচিত্র শংকর সাহা মধু

সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version