অর্থকাগজ প্রতিবেদন
পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, মৌসুম শেষ হওয়া এবং সরবরাহ কমে যাওয়ার যৌথ প্রভাবে রাজধানীর বাজারে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অধিকাংশ সবজিই এখন ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সয়াবিন তেলের দীর্ঘস্থায়ী সংকট, যা নিত্যপণ্যের বাজারে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) রাজধানীর নিউ মার্কেট, লালবাগ ও হাতিরপুলের বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এবং ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে সবজির বাজারে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। তবে এ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান কোনো বাজার তদারকি কার্যক্রম চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ করছেন ক্রেতারা।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, পটল প্রতি কেজি ১০০ টাকা, কাঁকরোল ১৬০ টাকা, বেগুন ১০০ থেকে ১৪০ টাকা, ঝিঙা, ধুন্দল, করলা ও শসা—সবই ১০০ টাকার ঘরে। বরবটি ও চিচিংগাও ৮০ থেকে ১০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হচ্ছে। তুলনামূলক কম দামের সবজির মধ্যেও স্বস্তি নেই—মূলা, টমেটো ও ঢ্যাঁড়শ ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। লাউ প্রতি পিস ৬০-৭০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া ৫০ টাকা কেজি, কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ টাকা এবং কচুর লতি ৮০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

হাতিরপুল বাজারে কেনাকাটা করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী মনিরুল ইসলাম বলেন, প্রায় প্রতিটি সবজির দামই অস্বাভাবিক। তার ভাষায়, “বেশিরভাগ সবজি ১০০ টাকার ওপরে, বাকি গুলোও ৮০ টাকার নিচে নয়। খুব কম সংখ্যক সবজি ৬০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি ক্রেতাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে।” তিনি অভিযোগ করেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে দাম বাড়লেও বাজার মনিটরিংয়ের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

অন্যদিকে বিক্রেতাদের দাবি, এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ সরবরাহ সংকট। হাতিরপুলের এক সবজি বিক্রেতা জানান, বেশ কয়েকটি সবজির মৌসুম শেষ হয়ে গেছে, ফলে নতুন সরবরাহ বাজারে আসার আগ পর্যন্ত দাম বেশি থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। পাইকারি বাজারেই বাড়তি দামে কিনতে হওয়ায় খুচরা পর্যায়ে দাম আরও বেড়ে যাচ্ছে।

সবজির এই ঊর্ধ্বগতির মধ্যে তেলের বাজারে পরিস্থিতি আরও অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা সত্ত্বেও রাজধানীর অধিকাংশ মুদি দোকানে সয়াবিন তেলের সংকট কাটেনি। অনেক দোকানেই তেল প্রকাশ্যে রাখা হচ্ছে না; পরিচিত ক্রেতা না হলে ‘তেল নেই’ বলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার শর্তসাপেক্ষে তেল বিক্রি করা হচ্ছে—যেমন নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল কিনতে হলে অতিরিক্ত পণ্য কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে।

লালবাগের বাসিন্দা ইসহাক মিয়ার অভিজ্ঞতা আরও ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরে। তিনি জানান, কয়েকটি দোকান ঘুরেও তেল না পেয়ে শেষে পরিচিত এক দোকান থেকে অপেক্ষা করে গোপনে ৫ লিটারের একটি বোতল কিনতে হয়েছে, যার দাম নেওয়া হয়েছে ৯৫৫ টাকা।

নিউ মার্কেট ও হাতিরপুলেও একই চিত্র দেখা গেছে। সয়াবিন তেলের সংকটের কারণে অনেক ক্রেতা বিকল্প হিসেবে সরিষার তেলের দিকে ঝুঁকছেন।

এর আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠকে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নাকচ করে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার নির্দেশনা দেয়। কিন্তু এক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও সেই সিদ্ধান্তের বাস্তব প্রতিফলন বাজারে দেখা যাচ্ছে না।

তবে নিত্যপণ্যের সব খাতে চাপ সমান নয়। বাজারে ব্রয়লার মুরগির দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল রয়েছে, প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সোনালি মুরগির দাম কিছুটা কমে ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকায় নেমেছে, যা আগে ৪৫০ টাকায় উঠেছিল। ডিমের দামও ১১৫ থেকে ১২০ টাকার মধ্যে স্থিতিশীল রয়েছে।

অন্যদিকে ঈদের সময় বেড়ে যাওয়া গরুর মাংসের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়েই রয়েছে। প্রতি কেজি ৮৫০ টাকায় বিক্রি হলেও দরদাম করে কিছু ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে কেনা যাচ্ছে।

সব মিলিয়ে, সরবরাহ সংকট, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতার সমন্বয়ে নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হচ্ছে—যার প্রধান চাপ বহন করতে হচ্ছে সাধারণ ভোক্তাদেরই।

সর্বশেষ হালনাগাদ 5 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version