অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
চালের বাজারে এখন এক ধরনের অস্বাভাবিক নৈরাজ্য বিরাজ করছে। দেশে চালের সামগ্রিক সরবরাহে কোনো ঘাটতি না থাকলেও হঠাৎ করেই পাইকারি ও খুচরা—দুই বাজারেই দাম বেড়ে গেছে। বিশেষ করে চিনিগুঁড়া ও বিভিন্ন চিকন জাতের চালের ক্ষেত্রে এই মূল্যবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে। বিক্রেতাদের তথ্যমতে, চিনিগুঁড়া চাল বস্তাপ্রতি প্রায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। পাশাপাশি মিনিকেট, নাজিরশাইল, জিরাশাইল, পাইজাম, স্বর্ণাসহ অন্যান্য চিকন চালের দামও বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রকৃত কোনো উৎপাদন বা সরবরাহ সংকট নেই। সম্প্রতি আমন ধান ঘরে উঠেছে এবং একই সঙ্গে বোরো মৌসুমের আবাদও শুরু হয়েছে। অর্থাৎ কৃষি উৎপাদনের দিক থেকে বাজারে চাপ পড়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। বরং অভিযোগ উঠেছে, করপোরেট হাউজ, মিল মালিক ও মধ্যস্বত্বভোগী একটি চক্র পরিকল্পিতভাবে চাল মজুত করে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে। গত দুই মাস ধরে চাল আমদানি বন্ধ থাকাকে সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করে তারা বাজারে দাম বাড়িয়েছে বলে পাইকারি বিক্রেতাদের অভিযোগ।
চাল আমদানিকারক আবদুল হান্নান জানান, বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কিছু মিল মালিক ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান বাজারে সরবরাহ কমিয়ে দিয়ে দাম বাড়িয়েছে। তাদের ধারণা ছিল সরকার নতুন করে আমদানির অনুমতি দেবে না। ফলে প্রতি কেজি চিকন চালের দাম ছয় থেকে সাত টাকা পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে সরকার ইতোমধ্যে ২ লাখ টন চাল আমদানির অনুমতি দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে সাতজন আমদানিকারক প্রায় সাড়ে ৩ হাজার টন চাল আনার অনুমোদন পেয়েছেন। এতে বাজারে সরবরাহ বাড়লে দাম কিছুটা কমবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
বিক্রেতারা জানান, গত দুই সপ্তাহ ধরে দফায় দফায় চালের দাম বাড়ানো হয়েছে। যেসব চালের বাজারে চাহিদা বেশি, বিশেষ করে চিনিগুঁড়া ও কাটারিভোগ, সেগুলোর দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। চিনিগুঁড়া চাল শুধু দেশীয় চাহিদা মেটাচ্ছে না, বরং রপ্তানিও হচ্ছে। ফলে এই চালের বস্তাপ্রতি দাম ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সামাজিক অনুষ্ঠান ও দাওয়াতে বহুল ব্যবহৃত কাটারিভোগ চালের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। বাজারে খাঁটি কাটারিভোগ চালের সরবরাহ খুবই কম; বর্তমানে মূলত হাইব্রিড জাতের কাটারিভোগ বিক্রি হচ্ছে, যার দামও বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা বেড়েছে।
পাহাড়তলী বাজার বণিক কল্যাণ সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম নিজাম উদ্দিন বলেন, চিনিগুঁড়া ও চিকন চালের দাম যেভাবে বেড়েছে, তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়। মিল মালিক, করপোরেট হাউজ ও মজুতদার মধ্যস্বত্বভোগীরাই মূলত এই মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে জড়িত। অথচ বাস্তবতায় দেশে চালের কোনো সংকট নেই।
রাইস মিল মালিক ও আমদানিকারক আবুল বশর চৌধুরী বলেন, ভারত থেকে গত দুই মাস চাল আমদানি বন্ধ থাকায় বাজারে চিকন চালের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। তবে সরকার আমদানির অনুমোদন দেওয়ায় পরিস্থিতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে বলে তিনি মনে করেন।
চট্টগ্রাম অঞ্চল খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর ও নওগাঁসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা চাল দিয়েই এখানকার চাহিদা মেটানো হয়। ফলে ওইসব অঞ্চলের মোকামে যদি কৃত্রিম সংকট বা কারসাজি হয়, তার সরাসরি প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামের বাজারে।
এদিকে সরকারের পক্ষ থেকে খোলা বাজারে চাল বিক্রি কার্যক্রম চালু রয়েছে, যদিও সেখানে মূলত মোটা জাতের চাল সরবরাহ করা হচ্ছে। চট্টগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক রিয়াদ কামাল রনি জানান, নগরীর ৪১টি পয়েন্টে প্রতিদিন মোট ৪১ টন চাল বিক্রি করা হচ্ছে। জেলার অন্যান্য এলাকাতেও এই কার্যক্রম চলমান রয়েছে। খোলা বাজারে চালের দাম কেজিপ্রতি ৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এই উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলে তিনি জানান। ●
অকা/প্র/ই/সকাল/১৯ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 week আগে

