অর্থকাগজ প্রতিবেদন

ডলার সংকট অনেকটা কেটে গেলেও আমদানি বাণিজ্যে আশানুরূপ গতি ফেরেনি। বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ বেড়েছে, রিজার্ভও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে; তবুও ব্যাংকগুলো আমদানির এলসি (লেটার অব ক্রেডিট) খোলার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। একইভাবে উদ্যোক্তারা নিজেরাও নতুন এলসি খোলায় আগ্রহী হচ্ছেন না। তাদের আশঙ্কা—বর্তমান বৈশ্বিক অস্থিরতা ও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ব্যবসা সম্প্রসারণ বা আমদানির জন্য উপযোগী নয়। গত সাড়ে তিন বছর ধরে চলা ডলার সংকট কাটলেও আমদানি ও ব্যবসায় তেমন ইতিবাচক পরিবর্তন আসেনি। এর নেপথ্যে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের দুর্বলতাকেও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি বাণিজ্যের জন্য এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ০.১৮ শতাংশ। একই সময়ে প্রকৃত আমদানি বেড়েছে ৪.১৮ শতাংশ। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাসে এলসি খোলা ও আমদানি সামান্য বাড়লেও এর আগের অর্থবছরে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। তখন আমদানি কমেছিল ৮.২৯ শতাংশ এবং এলসি খোলা কমে গিয়েছিল ০.৭৬ শতাংশ। এর আগে করোনার প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি ডলার সংকটের কারণে আমদানিতে বড় ধস নেমেছিল।

অর্থনীতির ইতিবাচক দিক হলো—নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বৈদেশিক দায় শোধ করার পাশাপাশি রপ্তানি আয় দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে রপ্তানি আয় বেড়েছে ৮.৬০ শতাংশ এবং চলতি অর্থবছরের জুলাই মাসে বেড়েছে রেকর্ড ২৫ শতাংশ। এর ফলে ডলারের প্রবাহও বেড়েছে। ইতিমধ্যে পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া প্রায় ৬০০ কোটি ডলার বৈদেশিক দায় পরিশোধ করা হয়েছে, পাশাপাশি নিয়মিত আমদানির দায়ও শোধ করা হচ্ছে। ডলার প্রবাহ বাড়তে থাকায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও ক্রমান্বয়ে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো—এ সমস্ত ইতিবাচক পরিবর্তনের কোনো প্রভাব এখনো আমদানিতে পড়েনি।

ব্যাংকাররা বলছেন, আমদানি অর্থায়নের ক্ষেত্রে এখন তারা অত্যন্ত সতর্ক। খেলাপি ঋণের চাপ আর বাড়ানো যাবে না, তাছাড়া আমদানির নামে যাতে অর্থপাচার না হয় সে বিষয়েও বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। ফলে এখন এলসি খোলার আগে ব্যাংকগুলো খতিয়ে দেখে পণ্যটি দেশে সত্যিই আসবে কিনা এবং যে কোম্পানি এলসি খুলছে তারা ঋণ শোধে কতটা সক্ষম। পরীক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য কোম্পানির এলসিই মূলত অনুমোদন পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক এলসি খোলার সময় শতভাগ মার্জিন নেওয়া হচ্ছে, যা উদ্যোক্তাদের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ সরবরাহ কমে যাওয়া এবং আমদানি অর্থায়নের বিপরীতে উচ্চ সুদহারও উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহিত করছে। ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত যেখানে ৯ শতাংশ সুদে আমদানি খাতে অর্থায়ন করত ব্যাংক, এখন সেখানে সুদহার দাঁড়িয়েছে ১৪ থেকে ১৮ শতাংশে। অনেক ব্যাংক আবার অতিরিক্ত চার্জও নিচ্ছে। ডলার বেশি দামে কিনতে হওয়ায় আমদানির খরচ আরও বেড়ে যাচ্ছে, ফলে উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।

বিশ্ববাজারের অনিশ্চয়তাও এলসি খোলায় অনীহার আরেকটি কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম অস্বাভাবিক ওঠানামা করছে। ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের শুরুতে বৈশ্বিক মন্দার কারণে তুলাসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম হঠাৎ পড়ে গিয়েছিল। যারা তখন বেশি দামে আমদানি করেছিলেন তারা লোকসানে বিক্রি করতে বাধ্য হন। এর ফলে উদ্যোক্তারা ব্যাংক ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হন এবং খেলাপি ঋণ এক বছরে দ্বিগুণ হয়ে যায়। ২০১১ সালে যেখানে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছিল ২২ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা, তা ২০১২ সালে এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৪২ হাজার ৭২৫ কোটি টাকায়। পরবর্তী বছর সামান্য কমলেও আবার বেড়ে ২০১৪ সালে ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায় এবং তারপর থেকে আর কমেনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যাংকগুলো এখন আমদানি অর্থায়নে অনেক বেশি সতর্ক।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে দেশের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। যদিও তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি গত অর্থবছরে কিছুটা বেড়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আশঙ্কা করছে আগামীতে এ খাত বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। উদ্যোক্তাদের মধ্যেও একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে। ফলে ডলার সংকট কেটে যাওয়ার পরও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রত্যাশিত গতিশীলতা দেখা যাচ্ছে না।
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১৮ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version