অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশের শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংকগুলোর ২০২৫ অর্থবছরের ডিভিডেন্ড ঘোষণায় মিশ্র চিত্র ফুটে উঠেছে। একদিকে বেশ কয়েকটি ব্যাংক আগের বছরের তুলনায় বেশি লভ্যাংশ ঘোষণা করে তাদের আর্থিক সক্ষমতা ও মুনাফার ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যাংক এবারও কোনো ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি, যা ব্যাংকিং খাতের বৈষম্যমূলক আর্থিক অবস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা গেছে, শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত ৩৬টি ব্যাংকের মধ্যে ২০২৫ অর্থবছরের জন্য ৩০টি ব্যাংক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। এর মধ্যে ৯টি ব্যাংক আগের বছরের তুলনায় লভ্যাংশ বাড়িয়েছে। বিপরীতে ৪টি ব্যাংকের ডিভিডেন্ড কমেছে এবং ৩টি ব্যাংক আগের বছরের সমপরিমাণ লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ১৪টি ব্যাংক কোনো ধরনের ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে পারেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংকগুলোর ডিভিডেন্ড ঘোষণা শুধু শেয়ারহোল্ডারদের জন্য নগদ বা বোনাস শেয়ারের বিষয় নয়; এটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক স্বাস্থ্য, মুনাফা অর্জনের সক্ষমতা, মূলধন ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। ফলে যেসব ব্যাংক ধারাবাহিকভাবে ডিভিডেন্ড বাড়াতে সক্ষম হয়েছে, সেগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থাও তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

২০২৫ অর্থবছরে ডিভিডেন্ড বাড়িয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক, যমুনা ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক এবং শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে ব্র্যাক ব্যাংক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকে। তিনটি ব্যাংকই আগের বছরের ২০ শতাংশ থেকে ডিভিডেন্ড বাড়িয়ে মোট ৩০ শতাংশ ঘোষণা করেছে। ব্র্যাক ব্যাংক ১৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ স্টক, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ২৫ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ স্টক এবং প্রাইম ব্যাংক ২৫ শতাংশ নগদ ও ৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। ফলে তিনটি ব্যাংকেরই মোট ডিভিডেন্ড ১০ শতাংশ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়েছে।

সিটি ব্যাংকও ইতিবাচক ধারা বজায় রেখে মোট ডিভিডেন্ড ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করেছে। ব্যাংকটি এবার ১৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৫ শতাংশ পয়েন্ট বেশি।

যমুনা ব্যাংকও লভ্যাংশ বৃদ্ধির ধারায় রয়েছে। ব্যাংকটি এবার ২৯ শতাংশ নগদ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে, যেখানে আগের বছর মোট ডিভিডেন্ড ছিল ২৬ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকটির মোট লভ্যাংশ ৩ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।

এনসিসি ব্যাংক ১৩ শতাংশ নগদ ডিভিডেন্ড থেকে এবার ১৭ শতাংশ নগদ ও ৪ শতাংশ স্টকসহ মোট ২১ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। এতে ব্যাংকটির মোট লভ্যাংশ ৮ শতাংশ পয়েন্ট বেড়েছে।

পূবালী ব্যাংক আগের বছরের ২৫ শতাংশ থেকে মোট ডিভিডেন্ড বাড়িয়ে ৩০ শতাংশ করেছে। ব্যাংকটি ১৫ শতাংশ নগদ ও ১৫ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। একইভাবে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক নগদ ডিভিডেন্ড ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৩ শতাংশ করেছে।

অন্যদিকে মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক আগের বছরের ১০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ডের পরিবর্তে এবার ১২ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, যেসব ব্যাংক ডিভিডেন্ড বাড়িয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই পরিচালন মুনাফা, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং সম্পদের গুণগত মান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবে একই সময়ে ১৪টি ব্যাংকের ডিভিডেন্ড ঘোষণা করতে না পারা ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান চ্যালেঞ্জের কথাই মনে করিয়ে দেয়। উচ্চ খেলাপি ঋণ, মূলধন ঘাটতি, মুনাফা কমে যাওয়া এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর নীতিমালার কারণে অনেক ব্যাংক এখনো শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিতে পারছে না।

বিশ্লেষকদের ভাষ্য, ব্যাংক খাতে ডিভিডেন্ডের এই বৈচিত্র্য বিনিয়োগকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। কারণ নিয়মিত ও ক্রমবর্ধমান ডিভিডেন্ড শুধু তাৎক্ষণিক আয়ই নিশ্চিত করে না, বরং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা এবং করপোরেট সুশাসনের প্রতিও ইতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে ধারাবাহিকভাবে ডিভিডেন্ড দিতে ব্যর্থ ব্যাংকগুলোতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক হয়ে আর্থিক সূচক, সম্পদের মান এবং ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধার সক্ষমতা বিবেচনা করার পরামর্শ দিচ্ছেন বাজার বিশেষজ্ঞরা।

সামগ্রিকভাবে ২০২৫ অর্থবছরের ডিভিডেন্ড চিত্র বলছে, শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত ব্যাংক খাতে এখনও বৈপরীত্য স্পষ্ট। কিছু ব্যাংক শক্তিশালী আর্থিক অবস্থানের কারণে শেয়ারহোল্ডারদের বেশি লভ্যাংশ দিতে সক্ষম হলেও, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যাংক এখনও আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ফলে আগামী সময়ে ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণগত মান, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং টেকসই মুনাফা অর্জনের সক্ষমতাই ডিভিডেন্ড প্রবণতার প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠবে।

সর্বশেষ হালনাগাদ 16 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version