অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

শীতের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের জ্বালানি খাতে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সংকট এখন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। তিতাস গ্যাসের পাইপলাইনে পর্যাপ্ত চাপ না থাকা এবং একই সঙ্গে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের সরবরাহে অনিয়ম ও সংকট—এই দুইয়ের মিলিত প্রভাবে ঘরোয়া রান্নাবান্না কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।

এই সংকট কেবল আবাসিক এলাকাতেই সীমাবদ্ধ নয়। সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের ঘাটতি ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। অনেক স্টেশনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাস না থাকায় যানবাহন চালকদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি প্রতিদিনই অবনতির দিকে যাচ্ছে, অথচ চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ কখন স্বাভাবিক হবে—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থাই নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। তবে জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা ধারণা দিচ্ছেন, এই অচলাবস্থা কাটতে অন্তত আরও দুই সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।

এলপিজি সংকট সামাল দিতে জ্বালানি বিভাগ সাময়িকভাবে আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ কমানো এবং ভোক্তা পর্যায়ে সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছে। বৃহস্পতিবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) এ প্রস্তাব পাঠানো হলেও এখনো চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যানের সঙ্গে এলপিজি অপারেটরদের সংগঠন লোটাবের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে লোটাব সভাপতি আমিরুল হক জানান, নতুন করে এলসি খোলা হচ্ছে এবং আমদানির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তবে বাজার স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগবে। কমিশন বৃদ্ধির আশ্বাস পাওয়ার পর এলপিজি ব্যবসায়ীদের ঘোষিত ধর্মঘটও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকে কমিশন বাড়ানোর দাবি দীর্ঘদিনের। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, ২০২১ সালের পর থেকে তাদের কমিশন বাড়ানো হয়নি, অথচ এই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যানও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় তাদের দাবিকে পুরোপুরি অযৌক্তিক বলা যায় না।

সরকারি সূত্রে জানা যায়, দ্রুত এলপিজি আমদানি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে আলোচনা চলছে। তবে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা—বিশেষ করে ইরানে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা। ওই দেশের পরিস্থিতির কারণে এলপিজির দাম বাড়ছে এবং বৈশ্বিক সরবরাহে টান পড়ছে, যার প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশেও। ফলে অনেক ব্যবসায়ী সময়মতো এলপিজি আনতে পারছেন না।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪ সালে প্রায় ১৬ লাখ টন এবং ২০২৫ সালে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কম। কেন আমদানির পরিমাণ কমেছে—এ নিয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। তবে জানুয়ারিতে আনুমানিক ১ লাখ ২০ হাজার টন এলপিজি আমদানি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, তিতাস গ্যাসের সরবরাহ নিয়েও সরকার গভীর উদ্বেগে রয়েছে। রাজধানীর মগবাজার, নয়াটোলা, আমবাগান, পাগলা মাজারসহ বহু এলাকায় ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে গ্যাস প্রায় নেই বললেই চলে। গভীর রাতে সামান্য গ্যাস এলেও ভোরের আগেই তা পুরোপুরি কমে যায়। ফলে দিনের বেলায় রান্নাবান্না প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন গৃহিণীরা।

মগবাজার এলাকার বাসিন্দা মারিয়া আক্তার বলেন, গত দেড় মাস ধরে রান্না করাটাই যেন প্রতিদিনের যুদ্ধ। ভোরে রান্না শুরু করলেও চাপ এত কম থাকে যে, শেষ করতে দুপুর গড়িয়ে যায়। অথচ গ্যাস ব্যবহার না করলেও প্রতি মাসে পূর্ণ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে—যা তাদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়ে তুলছে। একই ধরনের অভিযোগ হাতিরঝিল, নয়াটোলা, আমবাগান, ঝিলকাননসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের।

গ্যাসের বিকল্প হিসেবে যারা এলপিজি ব্যবহার করছেন, তারাও স্বস্তিতে নেই। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এতে রান্নার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করছেন, তিতাস গ্যাসের হটলাইন কিংবা রেগুলেটর বিভাগে যোগাযোগ করেও কার্যকর সমাধান মিলছে না। আগে অভিযোগ জানালে অন্তত সাময়িকভাবে চাপ বাড়ানো হতো, কিন্তু বর্তমানে কর্তৃপক্ষ কার্যত নীরব বলে তাদের অভিযোগ।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সামগ্রিকভাবে গ্যাস সরবরাহ খুব একটা কমেনি। তবে শীতকালে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় এই সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং শীত শেষে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, কেবল শীতকে দায়ী করে এত বড় সংকট ব্যাখ্যা করা যায় না। দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস অনুসন্ধানে বিনিয়োগের ঘাটতি, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে যাওয়া এবং শিল্পখাতে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে আবাসিক খাতকে উপেক্ষা করার ফলেই এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

চট্টগ্রামেও পরিস্থিতি ভিন্ন নয়। সেখানে এলপিজির সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। ১২ কেজির সিলিন্ডার খুচরা বাজারে প্রায় অদৃশ্য। সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৩০৬ টাকার সিলিন্ডার ২ হাজার টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার এটিকে কৃত্রিম সংকট বললেও ব্যবসায়ীদের দাবি, আমদানি কমে যাওয়াই মূল কারণ। কয়েকটি বড় কোম্পানি সাময়িকভাবে আমদানি বন্ধ রাখায় সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে।

অকা/প্র/ই/সকাল/১০ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 5 days আগে

Leave A Reply

Exit mobile version