অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
নতুন মৌসুম শুরু হলেও এবার আলুর বাজারে স্বস্তির পরিবর্তে দেখা দিয়েছে চরম হতাশা। সাধারণত বছরের এই সময়ে নতুন আলুর আগমনে বাজারে দাম কিছুটা ভালো থাকে। কিন্তু চলতি মৌসুমে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বাজারে এখনো বিপুল পরিমাণ পুরোনো আলুর মজুদ থাকায় নতুন আলুর দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে কৃষকদের ওপর।
রাজধানীর খুচরা বাজারে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকায়। অথচ মাঠ পর্যায়ে কৃষকরা একই আলু বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন মাত্র ১০ থেকে ১২ টাকায়, যা অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন খরচের চেয়েও কম। এতে করে শুরুতেই লোকসানের মুখে পড়ছেন আলুচাষীরা।
কৃষক ও কোল্ড স্টোরেজ মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত মৌসুমের বিপুল পরিমাণ আলু এখনো হিমাগারে রয়ে গেছে। সাধারণত এই সময়ের মধ্যে হিমাগারগুলো প্রায় খালি হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও এবার তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। পুরোনো আলুর এই অতিরিক্ত মজুদের কারণেই নতুন আলু বাজারে এলেও কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অনেক ক্ষেত্রে লোকসান গুনতে গুনতে দিশেহারা হয়ে পড়ছেন তারা।
আলুচাষীদের ভাষ্য অনুযায়ী, অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত আগাম জাতের আলু চাষ শুরু হয়। এসব আলু ৬৫ থেকে ৭৫ দিনের মধ্যেই তুলে বাজারজাত করা হয় এবং ‘নতুন আলু’ হিসেবে বিক্রি হয়। চলতি মৌসুমে আগাম জাতের আলু উৎপাদনে কেজিপ্রতি খরচ পড়ছে প্রায় ১৫ থেকে ১৭ টাকা। অথচ বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে ১০ থেকে ১২ টাকায়। এই দামে বিক্রি করলে মূলধন ফেরত পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক কৃষক আলু পরিপক্ব হয়ে গেলেও ক্ষেত থেকে তুলছেন না।
বগুড়া সদর উপজেলার কালিবালা এলাকার কৃষক জাহাঙ্গীর হোসাইন জানান, এবার তিনি ৪৫ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন, যার প্রায় অর্ধেকই আগাম জাতের। তার হিসাব অনুযায়ী, এক বিঘা জমিতে আগাম জাতের সাদা আলু চাষ করতে খরচ হয় অন্তত ৩৫ হাজার টাকা। উৎপাদন হয় সর্বোচ্চ ৬০ থেকে ৬৫ মণ। কিন্তু বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে এই আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা মণ দরে। ফলে উৎপাদন খরচই উঠছে না।
তিনি আরও বলেন, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী রোপণের ৭০ দিনের মধ্যেই আলু তুলে ফেলতে হয়। কিন্তু তার জমিতে ৭৫ দিন পার হয়ে গেলেও দাম না পাওয়ায় এখনো আলু তোলা সম্ভব হয়নি। সামনে ধান চাষের মৌসুম থাকায় দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে।
একই এলাকার আরেক কৃষক আব্দুল মোমিন জানান, তিনি এবার ১১ বিঘা জমিতে আগাম আলু চাষ করেছেন। তার মতে, আগাম আলু চাষীরা বর্তমানে চরম আতঙ্কের মধ্যে আছেন। দিন যত যাচ্ছে, আলুর বাজার ততই নিম্নমুখী হচ্ছে। উত্তরাঞ্চলের বড় বাজার মহাস্থানে সাদা আলু বিক্রি হচ্ছে ৬০০ টাকা মণ দরে, আর মাঠ পর্যায়ে ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে কিনছেন মাত্র ১০ থেকে ১১ টাকা কেজি দরে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতে দাম আরও কমেছে, ফলে আগাম আলু চাষ করে অধিকাংশ কৃষকই লোকসানে পড়ছেন।
শুধু আগাম জাত নয়, পাকরি জাতের আলুতেও লোকসান গুনতে হচ্ছে চাষীদের। বগুড়ার ফুলবাড়ি এলাকার কৃষক আশরাফুল ইসলাম জানান, তিনি তিন বিঘা জমিতে রোমানা পাকরি জাতের আলু চাষ করেছিলেন। সপ্তাহখানেক আগে এই আলু বিক্রি করেছেন এক হাজার টাকা মণ দরে। কিন্তু এই জাতের আলু শতকে এক মণের বেশি হয় না। সে হিসাবে এক বিঘা জমিতে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৩ মণ। বিক্রি করে যে টাকা পেয়েছেন, তা সার, কীটনাশক, শ্রমিকসহ অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে ঘাটতিতে পরিণত হয়েছে।
তার কথায়, “চাষাবাদ করেই আমাদের সংসার চলে। এখানে যদি আয় না থাকে, তাহলে পরিবার নিয়ে বাঁচব কীভাবে—এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।”
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, সাধারণত নভেম্বরের মধ্যেই হিমাগারগুলো খালি হয়ে যায়। কিন্তু এবার জানুয়ারির শুরুতেও প্রায় এক লাখ টন আলু কোল্ড স্টোরেজে মজুদ রয়েছে। ১৫ ডিসেম্বরের পর থেকে আলুচাষী কিংবা ব্যবসায়ীরা আলু তুলতে আসেননি। ওই সময় হিমাগারগুলোতে প্রায় পাঁচ লাখ টন আলু সংরক্ষিত ছিল।
বগুড়ার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও আরবি হিমাগারের মালিক পরিমল প্রসাদ রাজ জানান, তাদের কয়েকটি হিমাগারে এখনো পুরোনো আলু রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নতুন আলুর বাজারে।
বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোস্তফা আজাদ চৌধুরী বাবু বলেন, বর্তমানে আলু বিক্রি করে যে অর্থ পাওয়া যাচ্ছে, তা দিয়ে কোল্ড স্টোরেজের ভাড়াও ওঠানো যাচ্ছে না। এই কারণেই চাষী বা ব্যবসায়ীরা আলু তুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। এতে একদিকে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে হিমাগার মালিকরাও লোকসানে পড়ছেন। তার মতে, এই সময়ে হিমাগারে আলু থাকার কথা নয়, কিন্তু বাস্তবতা ঠিক উল্টো।
সংকট মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। গত বছর আলুচাষীরা ব্যাপক লোকসানে পড়ায় চলতি মৌসুমে চাষ কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এ পরিস্থিতিতে কৃষি মন্ত্রণালয় নভেম্বর মাসে প্রণোদনার ঘোষণা দিলেও বাস্তবে কৃষকরা এখনো কোনো সহায়তা পাননি। যদিও কৃষি উপদেষ্টা একাধিকবার গণমাধ্যমে প্রণোদনার কথা বলেছেন, মাঠপর্যায়ে এর প্রতিফলন নেই।
এর আগে গত আগস্টে সরকার ৫০ হাজার টন আলু কিনে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। পরে পরিকল্পনাটি বাতিল করে আলুচাষীদের জন্য অতিরিক্ত ভর্তুকির ঘোষণা দেওয়া হয়। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বাজেটে আলুচাষীদের জন্য ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, অতিরিক্ত ভর্তুকি যোগ হলে মোট বরাদ্দ দাঁড়াবে ২৬০ কোটি টাকায়।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়মতো প্রণোদনা কার্যকর না হলে তার সুফল অনেকটাই হারিয়ে যায়। কারণ কৃষকরা ইতোমধ্যে চাষাবাদ সম্পন্ন করেছেন। আগে সহায়তা দেওয়া হলে চাষে উৎসাহ বাড়ত এবং ক্ষতি কিছুটা হলেও কমানো যেত।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়েছে। এর মধ্যে আগাম জাতের আলু তোলা হয়েছে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমি থেকে, যেখানে উৎপাদন হয়েছে প্রায় আড়াই লাখ টন। তবে আগের বছর আলু চাষের জমির পরিমাণ ছিল আরও বেশি।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জানান, সেপ্টেম্বরেই তারা সতর্ক করেছিলেন যে সময়মতো সিদ্ধান্ত না নিলে কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়বেন। কিন্তু জানুয়ারি চলে এলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এস এম সোহরাব উদ্দিন বলেন, আলুচাষীদের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার প্রক্রিয়া অনেকদূর এগিয়েছে এবং শিগগিরই কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি জানান, যেসব কৃষক গত বছর ও চলতি বছর আলু চাষ করেছেন, তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, যাতে তারা আগের লোকসান কিছুটা হলেও পুষিয়ে নিতে পারেন।●
অকা/প্র/ই/দুপুর/৮ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 days আগে

