অর্থকাগজ প্রতিবেদন

বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে আমানত ও নগদ অর্থের প্রবাহে এক ধরনের অস্বাভাবিক বৈসাদৃশ্যের মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে ব্যাংকের বাইরে নগদ টাকার পরিমাণ ক্রমাগত বাড়ছে, অন্যদিকে আমানতের প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী অবস্থায় আটকে আছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই প্রবণতা অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৯৬ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক ০২ শতাংশ বেশি। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা ক্রমশ ব্যাংকের ওপর আস্থা হারাচ্ছেন এবং নগদ অর্থ হাতে রাখাকে বেশি নিরাপদ মনে করছেন। এটি ব্যাংক খাতের তারল্য সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে।

অন্যদিকে ব্যাংক খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ নয়। ২০২৫ সালের জুন শেষে ব্যাংক খাতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ বেশি। যদিও মে মাসে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ, তবুও গত বছরের একই সময়ের প্রবৃদ্ধি (৯ দশমিক ২৫ শতাংশ) থেকে এটি অনেক নিচে। গত ১৮ মাসে আমানত প্রবৃদ্ধির ওঠানামা লক্ষ্য করা গেলেও সামগ্রিক প্রবণতা নিম্নমুখী। ২০২৪ সালের আগস্টে প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছিল মাত্র ৭.০২ শতাংশে, যা ছিল ওই সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।

এই অবস্থার পেছনে মূলত কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করেছেন অর্থনীতিবিদরা। প্রথমত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের সঞ্চয় ক্ষমতা সীমিত করে ফেলেছে। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত উভয় পণ্যের দাম বৃদ্ধির কারণে জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮.৫৫ শতাংশে। ফলে মানুষকে আয়ের বড় অংশ ব্যয় করতে হচ্ছে ভোগ্যপণ্যে, যা সঞ্চয়ের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নিয়েছে, বাস্তবে তা অর্জন কঠিন হয়ে পড়ছে।

দ্বিতীয়ত, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। চলতি বছরে এটি দ্বিতীয়বারের মতো ৭ শতাংশের নিচে নেমেছে। বিনিয়োগ কম থাকায় নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে না, মানুষের আয়ও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। ফলস্বরূপ, সঞ্চয়ের সক্ষমতাও সংকুচিত হচ্ছে।

তৃতীয়ত, ব্যাংক খাতে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনা মানুষের আস্থাকে নষ্ট করেছে। দুর্বল ব্যাংকগুলোর আমানত ফেরত দিতে হিমশিম খাওয়ার খবর এবং ঋণ বিতরণে অনিয়ম মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। ফলে অনেকে ব্যাংকে টাকা জমা না রেখে নগদ অর্থ হাতে রাখছেন। ব্যাংকের বাইরে অর্থ জমে থাকা মানে অর্থনীতির প্রবাহ থেকে সেই অর্থ কার্যকরভাবে বাদ পড়ছে, যা বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের চেইনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, ব্যাংকের বাইরে বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ থাকা মানি ক্রিয়েশন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে। অর্থাৎ ব্যাংক খাতে জমা না পড়লে সেই অর্থের বিপরীতে নতুন ঋণ সৃষ্টি সম্ভব হয় না। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি, শিল্প সম্প্রসারণ এবং উদ্যোক্তা বিকাশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে।

সমাধানের পথ হিসেবে তারা বলছেন, প্রথমত ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। এজন্য দুর্বল ব্যাংকগুলোকে সংস্কার, অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা এবং আমানতকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে যাতে মানুষের হাতে প্রকৃত সঞ্চয়যোগ্য আয় বাড়ে। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়াতে স্বল্পসুদে ঋণপ্রবাহ, স্থিতিশীল নীতি সহায়তা এবং শিল্পখাতে উদ্ভাবনী প্রণোদনা দিতে হবে।

সার্বিকভাবে বলা যায়, ব্যাংকের বাইরে নগদ অর্থের বৃদ্ধি এবং আমানত প্রবৃদ্ধির নিম্নগতি অর্থনীতির জন্য এক ধরনের দ্বৈত চাপ তৈরি করেছে। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ব্যাংক খাতের তারল্য সংকট আরও প্রকট হবে এবং ঋণ প্রদানের সক্ষমতা কমে যাবে। যা দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১৯ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version