অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের শেয়ার বাজার কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) একীভূত করে একটি ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। এ লক্ষ্যে আজ অর্থ উপদেষ্টার নেতৃত্বে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে শুধু একীভূতকরণ নয়, শেয়ার বাজার–সংক্রান্ত আরও দুটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হবে।
এই বৈঠকের অন্যতম আলোচ্য বিষয় হলো—ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে শেয়ার সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)–কে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত করা। পাশাপাশি লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল)–কে ডিএসইর একটি সাবসিডিয়ারি কোম্পানিতে রূপান্তরের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে বিষয়গুলো নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ এই উদ্যোগকে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন।
ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মুসা এ প্রসঙ্গে বলেন, ডিএসইর তুলনায় সিএসইর বাজার পরিসর তুলনামূলকভাবে ছোট। ফলে দুই স্টক এক্সচেঞ্জ একীভূত হলেও বাজারের আকার নাটকীয়ভাবে বাড়বে—এমনটি নয়। তবে তিনি মনে করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি মনস্তাত্ত্বিক ইতিবাচক বার্তা দেবে। কারণ এখন শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর পারফরম্যান্স দুর্বল, করপোরেট বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে এবং বিশেষ করে মিউচুয়াল ফান্ড খাত মারাত্মক চাপে রয়েছে। এই অবস্থায় নতুন কোনো কাঠামোগত সংস্কার বাজারে আস্থার সঞ্চার করতে পারে।
ড. মোহাম্মদ মুসা আরও বলেন, সিডিবিএল শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হলে সেটিও একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হবে। কারণ প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক এবং নিয়মিত ভালো মুনাফা করে। তুলনামূলকভাবে ঝুঁকি কম থাকায় বিনিয়োগকারীদের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় বিনিয়োগ সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাঁর মতে, সিডিবিএল অনেক আগেই তালিকাভুক্ত হওয়া উচিত ছিল। এখন তালিকাভুক্ত হলে বাজার তা স্বাগত জানাবে।
সূত্র জানায়, আজ সকাল ১১টায় অনুষ্ঠিতব্য বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর বা তাঁর প্রতিনিধি, অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, শেয়ার বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান, ডিএসই ও সিএসইর চেয়ারম্যান, সিডিবিএল ও সিসিবিএলের চেয়ারম্যান এবং আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণয়–সংক্রান্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদায়) ড. আনিসুজ্জামান চৌধুরীকে এই বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। একইভাবে, শেয়ার বাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হলেও ব্রোকারেজ হাউজগুলোর প্রতিনিধিদেরও ডাকা হয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো বিষয়টি প্রাথমিক আলোচনার স্তরেই রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরেই দুই স্টক এক্সচেঞ্জ একীভূত করার দাবি উঠলেও বাস্তবায়ন সহজ নয়। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকায় ডিএসইর অনেক স্টেকহোল্ডার এই একীভূতকরণে আগ্রহী নন। পাশাপাশি পুরো প্রক্রিয়াটি জটিল হয়ে উঠেছে কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কারণে। ডিএসইতে বর্তমানে চীনের শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে যুক্ত রয়েছে। ফলে তাদের সম্মতি ছাড়া একীভূতকরণ বাস্তবায়ন কঠিন।
আরেকটি বড় বাস্তবতা হলো—বর্তমান সরকারের হাতে সময় সীমিত। এই অল্প সময়ে এত বড় কাঠামোগত সংস্কার বাস্তবায়ন সম্ভব কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে। ফলে প্রাথমিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরো বিষয়টির ভবিষ্যৎ অনেকটাই রাজনৈতিক সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
অন্যদিকে সিডিবিএল দেশের শেয়ার বাজারের অন্যতম লাভজনক ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠান। দুই স্টক এক্সচেঞ্জে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ শেয়ার লেনদেন হয়, তার সব তথ্য এই প্রতিষ্ঠানের সার্ভারে সংরক্ষিত থাকে। বিনিয়োগকারীদের ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্যও এখানেই রক্ষিত। ফলে প্রতিষ্ঠানটি তালিকাভুক্ত হলে তথ্য নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ঝুঁকি বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তালিকাভুক্তির বিপক্ষে মতও রয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৭ সালে বিএসইসির উদ্যোগে লেনদেন নিষ্পত্তির বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে সেন্ট্রাল কাউন্টারপার্টি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিসিবিএল) গঠন করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। সিডিবিএলের শেয়ার থাকা সত্ত্বেও সিসিবিএল কার্যত নিষ্ক্রিয় অবস্থায় রয়েছে। ফলে একে ডিএসইর সাবসিডিয়ারিতে রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন ও আলোচনা চলছে।
সব মিলিয়ে, ডিএসই ও সিএসই একীভূতকরণ, সিডিবিএলের তালিকাভুক্তি এবং সিসিবিএলের কাঠামোগত পরিবর্তন—এই তিন উদ্যোগই দেশের শেয়ার বাজার সংস্কারের পথে বড় সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে বাস্তবায়নের আগে নীতিগত, প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিক নানা চ্যালেঞ্জ পেরোতে হবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ●
অকা/পুঁবা/ই/সকাল/২৮ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 hours আগে

