অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
গত বছরটি দেশের পুঁজিবাজারের জন্য ছিল বেশ হতাশাজনক। এ সময় সূচকের পাশাপাশি দৈনিক গড় লেনদেনেও নিম্নমুখিতা পরিলক্ষিত হয়েছে। পুঁজিবাজারের হাতে গোনা কয়েকটি কোম্পানি সূচকের উত্থান-পতনে বড় ধরনের ভূমিকা রাখে। স্বাভাবিকভাবেই গত বছর পুঁজিবাজারের নিম্নমুখিতার পেছনে প্রভাবশালী শীর্ষ ১০ কোম্পানির উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। এ সময়ে এ শীর্ষ ১০ কোম্পানির বাজার মূলধন কমেছে ২১ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাজার মূলধন কমেছে গ্রামীণফোন, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানি (বিএটিবিসি) ও বেক্সিমকো লিমিটেডের।
২০২১ সাল শেষে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মোট বাজার মূলধন ছিল ৫ লাখ ৪২ হাজার ২০০ কোটি টাকা। ২০২২ সাল শেষে এক্সচেঞ্জটির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৬০ হাজার ৯৪০ কোটি টাকায়। মূলত সরকারি সিকিউরিটিজের তালিকাভুক্তির কারণে এক্সচেঞ্জটির বাজার মূলধন ২ লাখ ১৮ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা বেড়েছে। সরকারি সিকিউরিটিজ বাদ দিলে গত বছর ডিএসইর বাজার মূলধন কমেছে ৭ দশমিক ৯ শতাংশ।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর ওঠানামার ভিত্তিতেই নির্ধারিত হয় সূচকের উত্থান-পতন। সূচকের অধীন কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধন নির্ধারণে ব্যবহার করা হয় ফ্রি ফ্লোট পদ্ধতি। প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সময় যে-সংখ্যক শেয়ার ইস্যু করা হয়, সেগুলোই ফ্রি ফ্লোট শেয়ার। প্লেসমেন্টের মাধ্যমে ইস্যু করা শেয়ারের ওপর লকড ইন পিরিয়ড থাকা পর্যন্ত সেগুলো ফ্রি ফ্লোট শেয়ার হিসেবে গণ্য হয় না। এর বাইরে উদ্যোক্তা পরিচালক, সরকার এবং উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শেয়ারধারীর কাছে থাকা শেয়ারগুলোও ফ্রি ফ্লোট শেয়ার নয়। ফ্রি ফ্লোট শেয়ারের ভিত্তিতে যে কোম্পানির বাজার মূলধন যত বেশি, সূচকের উত্থান-পতনে সেই কোম্পানির শেয়ারের প্রভাবও তত বেশি।
গত বছর পুঁজিবাজারের প্রভাবশালী শীর্ষ ১০ কোম্পানির বাজার মূলধন কমার গ্রাফ ও ডিএসইর সার্বিক সূচক ডিএসইএক্সের পয়েন্ট হারানোর গ্রাফ প্রায় একই সমান্তরালে চলেছে। এসব কোম্পানির শেয়ার দর যখন কমেছে, পুঁজিবাজারের সূচকও তখন নিম্নমুখী ছিল। অন্যদিকে যখনই এসব কোম্পানির শেয়ার দর কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে, তখন পুঁজিবাজারের সূচকেও ঊর্ধ্বমুখিতা লক্ষ করা গেছে।
ফ্রি ফ্লোট বাজার মূলধনের দিক দিয়ে দেশের পুঁজিবাজারের শীর্ষ কোম্পানি স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ১৮ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকায়। ২০২১ সাল শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন ছিল ১৮ হাজার ৯৯৭ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ৩৯৯ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্ন কমেছে ২ দশমিক ১০ শতাংশ।
স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের হিসাব ও অর্থ বিভাগের প্রধান মো. কবির রেজা বলেন, সামষ্টিক অর্থনীতির বেশকিছু কারণে পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করছে। এ কারণে বড় বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে সাহস পাচ্ছেন না, যার প্রভাব পড়েছে পুঁজিবাজারে। এ কারণে শীর্ষ কোম্পানিগুলোর বাজার মূলধনও ছিল পড়তির দিকে। যদিও এসব কোম্পানির বেশির ভাগেরই ব্যবসায়িক ও আর্থিক পারফরম্যান্সের গ্রাফ এ সময়ে ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে বিএটিবিসির বাজার মূলধন ছিল ৩৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকা। ২০২২ সাল শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন ৬ হাজার ৩১৩ কোটি টাকা কমে ২৮ হাজার ১০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে বিএটিবিসির শেয়ারে রিটার্ন কমেছে ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ।
ওষুধ খাতের কোম্পানি রেনাটা লিমিটেডের বাজার মূলধন গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ১৩ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এর আগের বছরে কোম্পানিটির বাজার মূলধন ছিল ১৪ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির বাজার মূলধন কমেছে ৯৫ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্ন কমেছে দশমিক ৭০ শতাংশ।
রেনাটা লিমিটেডের কোম্পানি সচিব মো. জোবায়ের আলম বলেন, ‘গত বছর আমাদের ব্যবসা ও মুনাফায় যথেষ্ট প্রবৃদ্ধি হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের জন্য ভালো লভ্যাংশও ঘোষণা করা হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা ছিল কোম্পানি শেয়ারদরে এর প্রভাব প্রতিফলিত হবে। কিন্তু পুঁজিবাজারের সার্বিক পরিস্থিতি নিম্নমুখী হওয়ার কারণে আমাদের এ প্রত্যাশার প্রতিফলন দেখা যায়নি।’
বেক্সিমকো লিমিটেডের বাজার মূলধন ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১৩ হাজার ৫ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এটি ২ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা কমে ১০ হাজার ১৩০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্ন কমেছে ২২ দশমিক ১০ শতাংশ।
বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের বাজার মূলধন ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ৬ হাজার ৬০৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। আগের বছর শেষে কোম্পানিটির এ মূলধন ছিল ৫ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির বাজার মূলধন বেড়েছে ৯৮৪ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্ন বেড়েছে ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।
২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের বাজার মূলধন ছিল ৮ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এটি ২ হাজার ৭৪ কোটি টাকা কমে ৬ হাজার ৫২২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারের রিটার্ন কমেছে ২৪ দশমিক ১০ শতাংশ।
গত এক বছরে সবচেয়ে বেশি ৮ হাজার ৪৯৩ কোটি টাকার বাজার মূলধন হারিয়েছে গ্রামীণফোন। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন ছিল ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছর অর্থাৎ ২০২১ সাল শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন ছিল ৪৭ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্ন কমেছে ১৮ শতাংশ।
ব্র্যাক ব্যাংকের বাজার মূলধন ২০২১ সাল শেষে ছিল ৭ হাজার ৬৯৯ কোটি টাকায়। গত বছরের ডিসেম্বর শেষে এটি ৫ হাজার ৭৬২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির বাজার মূলধন কমেছে ১ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারে রিটার্ন কমেছে ২৫ দশমিক ২০ শতাংশ।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশের বাজার মূলধন এক বছরে ৭৩২ কোটি টাকা কমেছে। ২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৭ হাজার ৫২৬ কোটি টাকায়। এর আগের বছর শেষে কোম্পানিটির বাজার মূলধন ছিল ৮ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এ সময়ে কোম্পানিটির শেয়ারে রিটার্ন কমেছে ৮ দশমিক ৯০ শতাংশ।
২০২২ সালের ডিসেম্বর শেষে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৩১৩ কোটি টাকায়। এর আগের বছর শেষে এ মূলধন ছিল ৫ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকটির বাজার মূলধন বেড়েছে ১৬১ কোটি টাকা। এ সময়ে ব্যাংকটির শেয়ারে রিটার্ন বেড়েছে ৩ দশমিক ১০ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি, রিজার্ভ কমে যাওয়া, টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সার্বিকভাবে ব্যবসার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো গত বছরজুড়ে বিনিয়োগকারীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সার্বিকভাবে অর্থনীতি নিয়ে শঙ্কার কারণে পুঁজিবাজারে এর প্রতিফলন ঘটেছে। অধিকাংশ তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক ফলাফল আগের বছরের তুলনায় নিম্নমুখী ছিল। তার ওপর গত বছর পুঁজিবাজার থেকে উল্লেখযোগ্য হারে বিদেশীরা বিনিয়োগ প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। শীর্ষ বাজার মূলধনের কোম্পানিসহ মৌল ভিত্তির কোম্পানিতেই বিদেশীরা বিনিয়োগ করে থাকেন। ফলে এসব কোম্পানির শেয়ারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির প্রভাব পড়েছে।
অকা/পূঁবা/বিকেল, ১০ জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 years আগে

