অর্থকাগজ প্রতিবেদন
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটকে সন্তোষজনক বলে মনে করছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতি (বিকেএমইএ)। সংগঠনটির মতে, করব্যবস্থার সংস্কার এবং বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়ার মতো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ তৈরি পোশাক শিল্পের দীর্ঘদিনের দাবির প্রতিফলন ঘটিয়েছে।
বাজেট প্রতিক্রিয়ায় বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘‘এবারের বাজেটে তৈরি পোশাক শিল্পের দুটি প্রধান প্রত্যাশা ছিল—করব্যবস্থার সংস্কার এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটের প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থার আমদানি সহজ করা।
তিনি বলেন, ‘‘সৌরবিদ্যুৎ খাতে কর সুবিধা সম্প্রসারণ এবং মধ্যমেয়াদি নীতিকাঠামোর দিকে অগ্রসর হওয়ার উদ্যোগ শিল্প খাতের জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে। বিশেষ করে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, মাউন্টিং স্ট্রাকচার এবং সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির ওপর কর সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহায়ক হবে।’’
বিকেএমইএ’র মতে, শিল্প খাতের দীর্ঘদিনের একটি দাবি ছিল উৎসে কর্তিত অগ্রিম আয়কর (এআইটি) সমন্বয়, বহন অথবা ফেরতের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা। কারণ উৎসে কর কেটে নেওয়ার পর তা সময়মতো সমন্বয় বা ফেরত না হলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কার্যকর মূলধন আটকে যায়। এতে তারল্য সংকট তৈরি হয়, ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ে এবং শিল্পের স্বাভাবিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হয়। তবে এআইটি ফেরতের প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংগঠনটি।
বাজেটে রপ্তানিমুখী নন-বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানি এবং দেশীয় বন্ডেড প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগকে রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ হাতেম। পাশাপাশি রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য বিদ্যমান সুবিধা বহাল রাখা এবং বিভিন্ন প্রণোদনা ও নীতিগত সুবিধার মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে বাজেটের কিছু প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির মতে, পলিয়েস্টার স্ট্যাপল ফাইবার আমদানির ওপর ৫ শতাংশ কর আরোপ কতটা সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত, তা পুনর্বিবেচনা করা উচিত। বর্তমানে দেশে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান এ পণ্য উৎপাদন করে, যা মোট চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম পূরণ করতে সক্ষম। দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও তা যেন রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ক্ষুণ্ন না করে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে বিকেএমইএ সভাপতি বলেন, ‘‘দেশের গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে বাজেটে পর্যাপ্ত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের অভাব রয়েছে। সৌরবিদ্যুৎ আংশিক সমাধান দিতে পারে, তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সমাধানের জন্য দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়াতে হবে।’’
উচ্চ সুদের হারও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। ঋণের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশকে আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন মোহাম্মদ হাতেম। তিনি বলেন, ‘‘প্রতিবেশী অনেক দেশ শিল্পভূমি, মূলধন সহায়তা, শ্রমিক মজুরি সহায়তা এবং রপ্তানি প্রণোদনাসহ বিভিন্ন সুবিধা দিচ্ছে। নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণে বাংলাদেশকেও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে হবে।’’
কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিষয়ে বাজেটে কিছু আশাব্যঞ্জক উদ্যোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। বিশেষ করে সংকটে থাকা এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর জন্য সহায়তা কর্মসূচি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হলে শিল্প উৎপাদন পুনরুদ্ধার এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রাকে চিহ্নিত করেছে বিকেএমইএ। সংগঠনটির সভাপতি বলেন, ‘‘৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। করজালের আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করা না গেলে এই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হবে। সেক্ষেত্রে বিদ্যমান করদাতা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’’
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 hours আগে

