অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দশ কর্মদিবস পার করে ফের হাজার কোটি টাকার ঘরে পৌঁছেছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের লেনদেন। সূচকের মিশ্র আচরণ সত্ত্বেও পুঁজি বাজারটিতে লেনদেনের এ উন্নতি ঘটে। বাজারটির প্রধান সূচক ১৯ আগস্ট হ্রাস পায়। তবে বিশেষায়িত দু’টি সূচকই কমবেশি উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম ছিল। সূচকের এ মিশ্র আচরণ সত্ত্বেও লেনদেনের এ উন্নতিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিগত তিনটি কর্মদিবসে ডিএসই সূচকের যে উন্নতি ঘটে তাতে মূল্যস্তর বেড়ে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মুনাফা তুলে নিতে সচেষ্ট ছিলেন। এতে সংশোধন ঘটে বাজারে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৯ আগস্ট ৯ দশমিক ০১ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৫ হাজার ৪১৯ দশমিক ৯০ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি ১৯ আগস্ট দিনশেষে নেমে আসে ৫ হাজার ৪১০ দশমিক ৮৯ পয়েন্টে। তবে একই সময় বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২ দশমিক ৪৩ ও ৫ দশমিক ০৭ পয়েন্ট। অপর দিকে দেশের দ্বিতীয় পুঁজি বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সবগুলো সূচকের কমবেশি উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। এখানে সার্বিক মূল্যসূচক ৭ দশমিক ৩৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। বাজারটির বিশেষায়িত দুই সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৪১ দশমিক ৭৭ ও ৩ দশমিক ৫০ পয়েন্ট।

ঢাকা শেয়ার বাজার ১৯ আগস্ট ১ হাজার ৩৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৬২ কেটি টাকা বেশি। সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৯৭৫ কোটি টাকা। এর আগে ৩ আগস্ট ১ হাজার ১৩৭ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করেছিল পুঁজি বাজারটি। এর পরই সংশোধন ঘটতে থাকলে বাজারটির লেনদেন হ্রাস পেতে থাকে। ১১ আগস্ট ডিএসইর লেনদেন নেমে আসে ৬১০ কোটি টাকায়। তবে পরবর্তীতে সংশোধন থেকে উত্তরণ ঘটতে থাকলে লেনদেনও বৃদ্ধি পেতে থাকে। এভাবে ১৯ আগস্ট তা আবার হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়।

পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্টরা ডিএসইর লেনদেনের এ অগ্রগতিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, সংশোধনকালে বিনিয়োগকারীরা কিছুটা সতর্ক আচরণে থাকেন। এতে হ্রাস পায় লেনদেন।

এ দিকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের দ্বিতীয় বোর্ড স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ (এসএমই) বোর্ডে মূল্যসূচক গত এক বছরে ব্যাপক পতন ঘটেছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে ১০০০ পয়েন্টের ভিত্তিস্তর থেকে যাত্রা করা সূচকটি ২০২২ সালের আগস্টে পৌঁছে গিয়েছিল ২ হাজার ২৪৪ পয়েন্টে। এক বছরেরও কম সময়ে অস্বাভাবিক এ উত্থান ঘটে সূচকটির। ১৯ আগস্ট সূচকটির অবস্থান ছিল ৯৫৯ পয়েন্টে। অর্থাৎ ভিত্তিস্তর থেকেও কমে গেছে সূচকটি।

প্রসঙ্গত, স্বল্প মূলধনের কোম্পানিগুলোকে পুঁজি বাজারে আনা এবং ইতঃপূর্বে ডিএসইর মূল বোর্ড থেকে বিভিন্ন কারণে তালিকাচ্যুত হওয়া কোম্পানিগুলোকে নতুন করে আলাদা প্লাটফর্মে এনে বিনিয়োগকারীদের পুঁজির নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে ২০২১ সালে এসএমই বোর্ডের যাত্রা শুরু হয়। কিন্তু স্বল্প মূলধনী বোর্ড হওয়ায় বাজারে শেয়ারের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় সহজেই এসব কোম্পানি নিয়ে এক শ্রেণীর বিনিয়োগকারীরা অনৈতিক লেনদেনে লিপ্ত হয়। বিশেষ করে দু’টি কোম্পানির ক্ষেত্রে অস্বাভাবিকতার সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। এক সময় ডিএসইর মূল বোর্ডে থাকা হিমাদ্রি লিমিটেড ও ইউসুফ ফাওয়ার মিলসের ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ারের দর উঠে যায় যথাক্রমে সাড়ে ৬ হাজার টাকা ও ৯ হাজার টাকার কাছাকাছি। তাদের মধ্যে হিমাদ্রি লিমিটেড এক বছরে শেয়ার হোল্ডারদের জন্য লভ্যাংশ হিসেবে ৮০০ শতাংশ স্টক ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলে শেয়ার দরের এ উল্লম্ফন ঘটে। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ লভ্যাংশে সম্মতি না দিলে কোম্পানিটির শেয়ার দরে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। এ ছাড়া গত বছরের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাজার খেলোয়াড়েরা অদৃশ্য হয়ে গেলে ধারাবাহিক পতন ঘটতে থাকে এ বোর্ডের।

এসএমই বোর্ডের সূচকের এই পতনের প্রধান কারণ হলো তালিকাভুক্ত ২০টি এসএমই কোম্পানির মধ্যে কমপক্ষে ১৫টির শেয়ারের দামে ব্যাপক পতন। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, এই দরপতন অনিবার্য ছিল। কারণ কোম্পানিগুলোর মূল্যবৃদ্ধি ছিল কৃত্রিম এবং কোম্পানির বাস্তব আয় ব্যয়ের সাথে শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির কোনো তথ্য ও বাস্তবসম্মত সম্পর্ক ছিল না। গোটা দেশের অর্থব্যবস্থা যেভাবে লুটপাটের শিকার ছিল তেমনি ডিএসইর মূল বোর্ডের পাশাপাশি এই এসএমই বোর্ডেও প্রচণ্ড দাপট ছিল কারসাজিকারীদের। তবে মূল বোর্ড অপেক্ষাকৃত বড় হওয়ায় এসএমই বোর্ডই ক্ষতির শিকার হয়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি। গত বছরের ১৯ আগস্ট থেকে চলতি বছরের ১৮ আগস্ট পর্যন্ত এসএমই স্টকগুলোর দাম ৩% থেকে ৭৬% পর্যন্ত কমেছে। এর ফলে বড় অবনতির শিকার হয়েছে এসএমই বোর্ডের বাজার মূলধন।

এর আগে এসএমই সূচকের ঊর্ধ্বগতির পেছনে থাকা ইউসুফ ফাওয়ার মিলস এবং হিমাদ্রির মতো স্টকগুলো গত এক বছরে উল্লেখযোগ্য পতনের শিকার হয়েছে। ইউসুফ ফাওয়ারের শেয়ারের দাম ৬৭% কমে সোমবার দুই হাজার ১৮ টাকায় নেমে আসে, যা এক বছর আগে ছিল ৬ হাজার ১৩৭ টাকা। হিমাদ্রির শেয়ারের দামও কমে এক হাজার ২২ টাকায় নেমে এসেছে, যা এক সময় ছিল ৯ হাজার টাকার কাছাকাছি।

বাজার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে ছিল কারসাজিমূলক আচরণ ও গুজব। গত বছর এই দুই কোম্পানির শেয়ারের দাম এমনপর্যায়ে পৌঁছেছিল যে ভালো ডিভিডেন্ড দেয়া মূল বাজারের অনেক কোম্পানির শেয়ারের দামও এর ধারেকাছে ছিল না।

গত বছরের ১৮ আগস্ট নতুন বিএসইসি চেয়ারম্যান হিসেবে খন্দকার রাশেদ মাকসুদ দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর পদপে নিতে শুরু করেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন কমিশনের কঠোর মনোভাবের কারণে কারসাজিকারীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ায় যে যার অবস্থান থেকে শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছেন। নতুন কমিশন এখন বাজারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কাজ করছে এবং যারা অনিয়মের সাথে জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় আনার চেষ্টা করছে। ●

অকা/পুঁবা/ফর/রাত/১৯ আগস্ট, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 6 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version