অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
গত ১ জানুয়ারি থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রফতানিকারকদের কাঁচামাল ব্যবহার ও রফতানি–সংক্রান্ত সব কার্যক্রম পুরোপুরি অটোমেশনের আওতায় আনাকে বাধ্যতামূলক করার পর থেকেই ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, যে উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল সময় ও হয়রানি কমানো, বাস্তবে সেটিই এখন নানা জটিলতার উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাস্টমস বন্ড অটোমেশন সিস্টেম (সিবিএমএস) চালুর পর সফটওয়্যারের গুরুতর ত্রুটি, সিস্টেমের অস্বাভাবিক ধীরগতি এবং প্রক্রিয়াগত বিলম্বের কারণে তাদের স্বাভাবিক ব্যবসা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। ইউটিলিটি পারমিশন (ইউপি) পেতে অস্বাভাবিক সময় লাগছে, ফলে অনেক ক্ষেত্রে লেটার অব ক্রেডিটের (এলসি) মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। এতে রফতানি সময়মতো সম্পন্ন না হওয়ায় ক্রেতা ও সরবরাহকারী—উভয় পক্ষই আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।
রফতানিমুখী তৈরি পোশাক খাতে কাপড় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এনজেড অ্যাপারেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সালেউদ জামান খান জানান, সিবিএমএসে সফটওয়্যার সমস্যার কারণে ইউপি পেতে কখনো কখনো দুই সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগছে। ইউপি না পাওয়ায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বায়ারদের কাছে পণ্য পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না, যা রফতানি চুক্তি বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
রফতানিকারকরা শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পান। অনেক ক্ষেত্রে এই কাঁচামাল স্থানীয় সরবরাহকারীর কাছ থেকেও নেওয়া হয়। তবে স্থানীয় সরবরাহকারীদেরও কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে ইউপি নিতে হয়। আমদানিকৃত কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য পুরোপুরি রফতানি হয়েছে কি না—তা যাচাই করতেই মূলত ইউপি দেওয়া হয়। এই যাচাই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের বিভিন্ন দপ্তরের তথ্য মিলিয়ে দেখার বিষয়টি জড়িত, যা আগে সম্পূর্ণ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হতো।
ম্যানুয়াল ব্যবস্থায় অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। সময় ও অর্থের অপচয় কমাতে সরকার বন্ড অটোমেশন চালু করে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ও পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার অভাবে হঠাৎ করে এই সিস্টেম চালু করায় তারা এখন নতুন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।
রফতানিকারক ও প্রচ্ছন্ন রফতানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিবিএমএসে বাংলাদেশ ব্যাংকের ড্যাশবোর্ড পুরোপুরি সংযুক্ত না থাকা, এনবিআরের ডিউটি ড্র-ব্যাক অফিসের সঙ্গে সমন্বয়ের ঘাটতি, বিল অব এন্ট্রির তথ্য না দেখা যাওয়া এবং কাঁচামাল–সংক্রান্ত তথ্য সিস্টেমে অনুপস্থিত থাকার মতো সমস্যাগুলো প্রায় নিয়মিত হয়ে উঠেছে। এর ফলে ইউপি অনুমোদনে বিলম্ব হচ্ছে কিংবা পুরো প্রক্রিয়াই আটকে যাচ্ছে। ইনপুট–আউটপুট কোইফিশিয়েন্ট অনুমোদন নিয়েও জটিলতার কথা জানিয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী।
বর্তমানে কাস্টমস বন্ড–সংক্রান্ত কার্যক্রম দেশের তিনটি অফিসের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। এ বিষয়ে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা দক্ষিণের কমিশনার মোহাম্মদ হাসমত আলী বলেন, ছোটখাটো কিছু সমস্যা থাকলেও সেগুলোর সমাধান হচ্ছে এবং বড় ধরনের কোনো সংকট নেই।
তবে কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা উত্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বীকার করেন, সিস্টেমে কিছু বাস্তব সমস্যা রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কারণে কিছু ক্ষেত্রে এখনো ম্যানুয়াল পদ্ধতির সহায়তা নিতে হচ্ছে। পাশাপাশি সিস্টেমের সীমাবদ্ধতার কারণে লেদার পণ্য খাতের রফতানিকারকদের এখনো পুরোপুরি সিবিএমএসের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে গত রোববার (২৫ জানুয়ারি) এক সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান জানান, নতুন ব্যবস্থার শুরুতে কিছু জটিলতা থাকাটা স্বাভাবিক, তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো সংশোধন করা হবে।
অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ মনে করছে, কেবল প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতাই নয়—মানসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধাও সমস্যাকে বাড়িয়ে তুলছে। তাদের অভিযোগ, কাস্টমসের একটি অংশ, বিশেষ করে জুনিয়র পর্যায়ে, অটোমেশন ব্যবস্থাকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছেন না। নতুন ব্যবস্থায় ‘অন্যায্য সুবিধা’ কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং সিস্টেম ব্যবহারে অনীহার কারণে বাস্তব সমস্যাগুলো আরও জটিল হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে কিছু রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের কমার্শিয়াল কর্মকর্তারাও অনলাইন ব্যবস্থার প্রতি অনাগ্রহী, যা সামগ্রিকভাবে বন্ড অটোমেশন কার্যক্রমকে কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে দিচ্ছে না—এমন আশঙ্কাই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে ব্যবসায়ীদের মধ্যে। ●
অকা/প্র/ই/সকাল/২৮ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 9 hours আগে

