অর্থকাগজ ডেস্ক

আমাদের দেশে ইউনিয়নপের কার্ড ইস্যু শুরু হয়েছিল বেসরকারি খাতের মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের হাত ধরে। এরপর কার্ড পরিসেবাটির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দ্য সিটি ব্যাংক ও ইস্টার্ন ব্যাংক। ভিসা-মাস্টারকার্ডের তুমুল জনপ্রিয়তার মধ্যেও ব্যাংক তিনটির হাত ধরে সম্প্রসারিত হচ্ছিল ইউনিয়নপের বাজার। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীনা এ কার্ড পেমেন্ট ব্যবস্থার চাহিদা ও জনপ্রিয়তা বেড়েছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় বিশ্ব অর্থনীতিতে একধরনের বিকেন্দ্রীকরণ শুরু হয়ে গিয়েছে। এতে সামনের দিনগুলোয় বাংলাদেশের বাজারে ইউনিয়নপের চাহিদা আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ব বাজারে  চীনা ইউনিয়নপের প্রবেশ ২০১২ সালে। প্রবেশের পর থেকেই দ্রুতগতিতে সম্প্রসারিত হয়েছে ইউনিয়নপের বাজার। পরিসংখ্যান বলছে, এরই মধ্যে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে অনুমোদন পেয়েছে চীনা এ কার্ড সেবা। অন্তত ৯৫টি দেশ থেকে ইস্যু হচ্ছে ইউনিয়নপের ডেবিট, ক্রেডিট, প্রিপেইড কার্ড। ইউনিয়নপের ব্যবসায়িক অংশীদারিত্ব স্থাপিত হয়েছে বিশ্বব্যাপী অন্তত আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।

বর্তমানে ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ডের পাশাপাশি প্রিপেইড কার্ড, কমার্শিয়াল কার্ড, প্রিমিয়াম কার্ড ও থিম কার্ড ইস্যু করার সুযোগ দিচ্ছে ইউনিয়নপে। আর্থিক পরিসেবাটির মোবাইল পেমেন্ট সেবাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইউনিয়নপে মোবাইল কুইকপাস, ইউনিয়নপে অ্যাপ ও কিউআর কোড পেমেন্ট। এছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইউনিয়নপে কার্ড ইমারজেন্সি অ্যাসিস্ট্যান্ট সার্ভিস, ক্রস বর্ডার রেমিট্যান্স, ইউনিয়নপে টেক্স রিফান্ড, স্টাডি অ্যাবরোড সার্ভিস, ইউ রিওয়ার্ড প্ল্যাটফর্ম, ইনস্টলমেন্ট সার্ভিস, চীনের ভিসা আবেদনে এক্সপ্রেস সার্ভিসও দিচ্ছে ইউনিয়নপে।

ইউনিয়নপে বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার মাসুদ রায়হান বলেন, ইস্যুকৃত কার্ড সংখ্যার দিক থেকে ইউনিয়নপে বর্তমানে বিশ্বের বৃহৎ একটি আর্থিক পরিসেবা। শুধু চীনেই ডেবিট, ক্রেডিট ও প্রিপেইডসহ অন্যান্য ধরন মিলিয়ে ইউনিয়নপের ইস্যুকৃত কার্ডের সংখ্যা প্রায় ৭০০ কোটি। আর এর বাইরে বিশ্বব্যাপী ইস্যুকৃত কার্ডের সংখ্যাও ১৪০ কোটি। এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল ও আফ্রিকায় ইউনিয়নপের কার্ড তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দ্রুতগতিতে এ কার্ড পরিসেবা পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। বাংলাদেশে এরই মধ্যে তিনটি ব্যাংক ইউনিয়নপের কার্ড ইস্যু করছে। চলতি বছরেই এ সংখ্যা আরো বাড়বে। ব্যাংক ছাড়াও অন্যান্য গেটওয়েতেও ইউনিয়নপের পেমেন্ট অনুমোদিত হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তা পাওয়া ভিসা কার্ডের যাত্রা ১৯৫৮ সালে। ব্যাংক অব আমেরিকার হাত ধরে শুরু হওয়া আর্থিক সেবাটির বয়স ৬৩ বছরের বেশি। জনপ্রিয় আর্থিক পরিসেবা মাস্টারকার্ডের বয়সও ৫৬ বছর। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এ কার্ড সেবার কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ১৯৬৬ সালে। ভিসা, মাস্টারকার্ড ও আমেরিকান এক্সপ্রেস (অ্যামেক্স)—এ তিনটি আর্থিক সেবা বিশ্বের কার্ডভিত্তিক লেনদেনের সিংহভাগ দখলে রেখেছে। তবে এসব কার্ড পরিসেবা চীনের বাজারে অচল। দেশটি নিজেদের জনগণের জন্য ২০০২ সালে চালু করে ইউনিয়নপে। প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের এ দেশের জনগণ বাধ্যতামূলকভাবে অ্যাপভিত্তিক আর্থিক পরিসেবা উইচ্যাট এবং ইউনিয়নপে কার্ড ব্যবহার করে। ২০১২ সাল পর্যন্ত ইউনিয়নপের বাজার শুধু চীনের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ ছিল। ওই বছর থেকে বিশ্বব্যাপী কার্যক্রম সম্প্রসারিত করে ইউনিয়নপে। এরপর দ্রুতই বিশ্বের সব প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে কার্ডভিত্তিক আর্থিক সেবাটির কার্যক্রম।

বৈশ্বিক পরিসংখ্যান সেবা স্ট্যাটিস্টার ২০১৭ সালের পরিসংখ্যানে উঠে আসে, ওই সময় বৈশ্বিক ক্রেডিট কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইউনিয়নপের অবস্থান ছিল তৃতীয়। বৈশ্বিক ক্রেডিট কার্ডের বাজারে প্রায় ২০ শতাংশ ছিল সেবাটির দখলে। ৫০ শতাংশ ছিল ভিসার দখলে। ২৫ দশমিক ৬ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল মাস্টারকার্ড।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে বর্তমানে ইউনিয়নপে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ কার্ডভিত্তিক আর্থিক পরিসেবায় রূপান্তর হয়েছে। বাজার দখলের দিক থেকে ইউনিয়নপে এরই মধ্যে মাস্টারকার্ডকে পেছনে ফেলেছে। শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে ভিসা। মার্কিন দুই কার্ড পেমেন্ট সেবা ভিসা ও মাস্টারকার্ড আজকের অবস্থানে আসতে ৬০ বছর সময় নিয়েছে। কিন্তু ইউনিয়নপে মাত্র দুই দশকের মধ্যেই বিশ্বব্যাপী শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে ফেলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে চীনের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইউনিয়নপের অবস্থান আরো দৃঢ় হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের ব্যাংকগুলোর মধ্যে সবেচেয়ে বেশি এটিএম বুথ রয়েছে বেসরকারি খাতের ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের। ২০১৪ সালে এ ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করে ইউনিয়নপে। চুক্তির আওতায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের সব এটিএম বুথে ইউনিয়নপের কার্ড গ্রহণযোগ্যতা পায়। এরপর ২০১৮ সালের নভেম্বরে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের (এমটিবি) সঙ্গে অংশীদারিত্বমূলক চুক্তি করে ইউনিয়নপে ইন্টারন্যাশনাল। চুক্তির আওতায় বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক হিসেবে ইউনিয়নপে ইন্টারন্যাশনালের ইউনিয়নপে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ড (কনটাক্ট ও কনটাক্টলেস) ইস্যু করা শুরু করে এমটিবি। এমটিবির পয়েন্ট অব সেলস (পস) মেশিন ও এটিএমে ইউনিয়নপে ইন্টারন্যাশনালের কার্ড গ্রহণ এবং ইউনিয়নপে কিউআর কোড, পিটুপি এবং মানি এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন সেবারও প্রচলন শুরু হয় ওই চুক্তির ভিত্তিতে।

ইউনিয়নপের কার্ড পরিসেবার বিষয়ে জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক অনেক বড়। বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের অনেকে চীনে যাচ্ছেন। এ শ্রেণীর গ্রাহকদের জন্যই আমরা ইউনিয়নপের কার্ডটি ইস্যু করা শুরু করেছিলাম। করোনা পরিস্থিতিসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে কার্ডটি এখনো খুব বেশি জনপ্রিয়তা পায়নি। তবে ইউক্রেন যুদ্ধসহ বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে আগামীতে ইউনিয়নপের পরিসেবা আরো বেশি জনপ্রিয় হবে। আমরাও নতুন করে কার্ডটির প্রচার-প্রসারের উদ্যোগ নিচ্ছি।

কার্ড ইস্যুর জন্য ২০২০ সালে ইউনিয়নপের সঙ্গে চুক্তি করেছে বেসরকারি খাতের দ্য সিটি ও ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেড। বিশ্বের চারটি প্রধান কার্ড নেটওয়ার্কের সবক’টিই ইস্যু করছে সিটি ব্যাংক। দেশে ক্রেডিক কার্ড বিপণন ও পস মেশিন সরবরাহের দিক থেকে ব্যাংকটির জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি। এমটিবি, সিটি ও ইস্টার্ন ব্যাংক মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ইউনিয়নপের ১ লাখ ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ইস্যু করেছে বলে জানা গেছে। গত বছরের জানুয়ারিতে দেশের অন্যতম পেমেন্ট গেটওয়ে এসএসএল কমার্জের সঙ্গে চুক্তি করে ইউনিয়নপে। ওই চুক্তির আওতায় ইউনিয়নপের কার্ডধারীদের বাংলা কিউআর কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দ্য সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন বলেন, দেশে ক্রেডিট কার্ড বিপণনসহ ডিজিটাল বিভিন্ন সেবা প্রদানের দিক থেকে সিটি ব্যাংকের অবস্থান শীর্ষস্থানে। এতদিন আমরা বিশ্বের শীর্ষ তিন কার্ডভিত্তিক আর্থিক পরিসেবা দিয়ে এসেছি। ২০২০ সালে নতুন করে ইউনিয়নপে যুক্ত হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ আর্থিক পরিসেবাও জনপ্রিয়তা পেয়েছে। আগামীর বিশ্ব ব্যবস্থায় ইউনিয়নপে নেতৃত্বের আসনে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

#

অকা/ব্যাংখা/ বিকেল, ১০ মার্চ, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version