অর্থকাগজ প্রতিবেদন
নতুন উদ্যোক্তা, উদ্ভাবনী ধারণা এবং সম্ভাবনাময় স্টার্টআপ উদ্যোগগুলোকে অর্থায়নের আওতায় আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করেছে। এই তহবিল থেকে উদ্যোক্তারা মাত্র ৪ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে পারবেন। একই সঙ্গে বাণিজ্যিক ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে (এনবিএফআই) নিজ নিজ মুনাফার কমপক্ষে এক শতাংশ অর্থ নিয়ে আলাদা তহবিল গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যা স্টার্টআপ ও উদ্ভাবনী প্রকল্পে বিনিয়োগে ব্যবহৃত হবে।

২০২৫ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক এক সার্কুলারের মাধ্যমে এই নির্দেশনা জারি করে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠিয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়, এই নির্দেশনা অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং উদ্যোক্তারা তাৎক্ষণিকভাবে এই সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবেন।

এই তহবিলের আওতায় নতুন উদ্যোক্তা, ভিন্নধর্মী প্রকল্প বা সম্ভাবনাময় ব্যবসায়িক ধারণার ওপর ভিত্তি করে যে কেউ ব্যবসা শুরু করতে ঋণ নিতে পারবেন। পাশাপাশি যারা ইতিমধ্যে ব্যবসায় নিয়োজিত, তারা তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে এই তহবিল থেকে সহায়তা নিতে পারবেন। পূর্বে যেখানে স্টার্টআপ উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ১ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হতো, এখন সেই সীমা বাড়িয়ে সর্বনিম্ন ২ কোটি ও সর্বোচ্চ ৮ কোটি টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক নিজস্ব অর্থ থেকে প্রাথমিকভাবে যে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছে, তা থেকে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে উদ্যোক্তাদের এই ঋণ দেওয়া হবে। এসব ঋণ ৪ শতাংশ বার্ষিক সরল সুদে দেওয়া হবে। একইসঙ্গে, ২০২১ সাল থেকে ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর নিরীক্ষিত মুনাফা থেকে প্রতিবছর কমপক্ষে এক শতাংশ করে অর্থ নিয়ে পৃথক একটি বিশেষ তহবিল গঠনের বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে। এই অর্থও উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানে ব্যবহৃত হবে এবং এখানেও সুদের হার হবে স্বল্প।

এ তহবিল থেকে ঋণের জন্য আবেদন করতে হলে উদ্যোক্তার বয়স কমপক্ষে ২১ বছর হতে হবে। একক মালিকানার পাশাপাশি যৌথ উদ্যোগের স্টার্টআপ ব্যবসাও এই সুবিধার আওতায় আসবে। এছাড়া, যেসব উদ্যোক্তা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বা আন্তর্জাতিক সংস্থার আয়োজিত স্টার্টআপ প্রতিযোগিতায় নির্বাচিত বা পুরস্কারপ্রাপ্ত হয়েছেন, তারা ঋণ প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পাবেন।

প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধনের তারিখ অনুসারে ঋণের সীমাও নির্ধারণ করা হয়েছে। নিবন্ধনের বয়স ২ বছরের কম হলে সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা, ২ থেকে ৬ বছরের মধ্যে হলে সর্বোচ্চ ৫ কোটি টাকা এবং ৬ থেকে ১২ বছরের মধ্যে হলে সর্বোচ্চ ৮ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাওয়া যাবে। তবে যেসব উদ্যোক্তা প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছেন বা একেবারে নতুন, তারা সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ নিতে পারবেন।

তহবিলটির প্রক্রিয়া পুনঃঅর্থায়নযোগ্য ও পুনর্বিনিয়োগযোগ্যভাবে গঠন করা হয়েছে। অর্থাৎ, ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানি যে অর্থ গ্রাহকের কাছ থেকে আদায় করবে তার মূলধন অংশ তহবিলে ফেরত আসবে, ফলে সেই অর্থ দিয়ে আবার নতুন উদ্যোক্তাকে ঋণ দেওয়া যাবে। তবে গ্রাহকের কাছ থেকে প্রাপ্ত সুদ বা মুনাফা ব্যাংকের নিজস্ব আয়ের অংশ হিসেবে গণ্য হবে।

এই ঋণ পরিশোধের জন্য গ্রাহকদের সর্বোচ্চ ৮ বছর পর্যন্ত সময় দেওয়া হবে। এর মধ্যে প্রকল্পভেদে ৬ মাস থেকে ২ বছর পর্যন্ত গ্রেস পিরিয়ডের সুযোগ থাকবে। প্রয়োজনে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ঋণের মেয়াদ নবায়ন করা যাবে। তবে ৮ বছরের বেশি মেয়াদি ঋণ হলে সেখানে বাজারভিত্তিক সুদের হার প্রযোজ্য হবে।

সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, সব ব্যাংক বা ফাইন্যান্স কোম্পানি এই তহবিল ব্যবহারে অংশ নিতে পারবে না। শুধুমাত্র যেসব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট খেলাপি ঋণের হার ১০ শতাংশের নিচে, তারাই এই তহবিলে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে। ১০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ থাকলে সে ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের অনুমতি থাকবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগকে অর্থনীতিবিদ ও শিল্প উদ্যোক্তারা একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য এই তহবিল নতুন উদ্যম ও সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে। একইসঙ্গে দেশে উদ্ভাবনী ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবসার বিস্তারে সহায়ক হবে। 
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১০ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version