অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
ব্যাংকিং খাতে চলমান ডিজিটাল রূপান্তর সত্ত্বেও বাংলাদেশের মোট গ্রাহকের প্রায় ৭৫ শতাংশ এখনো কোনো ধরনের ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার আওতার বাইরে রয়েছেন। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এই চিত্র উঠে এসেছে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “বর্তমানে যেসব গ্রাহক অন্তত একটি ডিজিটাল ব্যাংকিং পণ্য বা সেবা ব্যবহার করছেন, তাদের গড় হার মাত্র ২৪.২৪ শতাংশ।” অর্থাৎ চার ভাগের তিন ভাগের বেশি গ্রাহক এখনো পুরোপুরি ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিংয়ের ওপরই নির্ভরশীল।
‘ডিজিটাল রূপান্তরের প্রভাব রিটেল ব্যাংকিংয়ের ওপর: ব্যাংকিং পণ্যে উদ্ভাবন’ শীর্ষক এই গবেষণা প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, গবেষণাকৃত জনগোষ্ঠীর মধ্যে গড়ে রিটেইল ব্যাংকিং গ্রাহকদের মাত্র এক-চতুর্থাংশেরও কম (অর্থাৎ ২৫% এর নিচে) সক্রিয়ভাবে মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, ইউএসএসডি সেবা বা অন্যান্য ডিজিটাইজড পণ্য ব্যবহার করছেন।
গ্রাহক সংখ্যা ও অ্যাকাউন্টের পরিসংখ্যান
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে মোট অ্যাকাউন্ট বা ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪১৮.৯০ মিলিয়ন (৪১ কোটি ৮৯ লাখ)। এই বিশাল সংখ্যা ব্যাংকিং খাতে দ্রুত ও ব্যাপক ডিজিটাল সম্প্রসারণের সাক্ষ্য বহন করছে। এর মধ্যে:
- ৪০.৩৪% গ্রাহক শাখা-ভিত্তিক আমানত অ্যাকাউন্টধারী (ঐতিহ্যবাহী ব্যাংকিং)
- ৩৪.৭৬% মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিসেস (এমএফএস) গ্রাহক (নগদের গ্রাহক বাদ দিয়ে)
- এছাড়া এমএফএস এজেন্ট, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল অ্যাপ ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং ব্যবহারকারী রয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণিতে।
গবেষণার পদ্ধতি
বিআইবিএম-এর অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান আলম ও সহযোগী অধ্যাপক ড. শামসুন নাহার মমতাজের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় ৩২টি তফসিলি ব্যাংককে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রিটেল ব্যাংকিং গ্রাহকদের মধ্যে থেকে ৩২০ জনের সরাসরি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার বিআইবিএম মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এই ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নরের মন্তব্য
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর ও বিআইবিএম নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান নুরুন নাহার বলেন,
“ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও পথে রয়েছে কিছু গুরুতর ও পদ্ধতিগত বাধা, যা অবিলম্বে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সমাধান করতে হবে।”
তিনি সবচেয়ে বড় দুটি চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন:
- প্রযুক্তি ও অবকাঠামোতে বিশাল বিনিয়োগের খরচ
- সাইবার নিরাপত্তাহীনতা ও প্রতারণার ক্রমবর্ধমান হুমকি
তিনি আরও জানান, ব্যাংকগুলোর ৬৮.৫০% এখনো ডিজিটাল পরিপক্কতার মাত্রায় ‘স্টেজ ২: উন্নয়নশীল ও চলমান’ পর্যায়ে রয়েছে। এই পর্যায়ে ব্যাংকগুলোর কোর ব্যাংকিং সিস্টেম এখনো বিচ্ছিন্ন (siloed), ফলে সত্যিকারের সমন্বিত, নমনীয় ও বিঘ্নকারী (disruptive) ডিজিটাল সেবা প্রদান সম্ভব হচ্ছে না।
এর ফলে গ্রাহক সন্তুষ্টির ক্ষেত্রে বড় ফারাক তৈরি হয়েছে। প্রায় ৪৮% গ্রাহক হয় অসন্তুষ্ট, নয়তো নিরপেক্ষ — যার মূল কারণ অবিশ্বস্ত সিস্টেম, নেটওয়ার্ক সমস্যা, দীর্ঘ লেনদেন সময় ইত্যাদি।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ব্যাপক গ্রাহক গ্রহণের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব — যা ২৩.২% ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
ডিজিটাল চ্যানেলের বিস্তৃতি
গত এক দশকে ব্যাংকিং সেবা প্রদানের চ্যানেলে নাটকীয় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সাল নাগাদ মোট সেবা প্রদান কেন্দ্র (delivery points) ১৬ লাখ ছাড়িয়েছে। এর মধ্যে:
- ৮৮.২৭% এমএফএস এজেন্ট
- মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপ সবচেয়ে জনপ্রিয় চ্যানেল (৮১.৬২% ব্যবহারকারী)
- এটিএম এখনো দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ব্যবহৃত চ্যানেল (৭২.৯০%)
- ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে ব্যবহৃত ডিভাইসের ৭১.২১%ই স্মার্টফোন
এই গবেষণা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, অবকাঠামো ও সংখ্যাগত সম্প্রসারণে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি, কিন্তু গুণগত মান, নিরাপত্তা, গ্রাহক সন্তুষ্টি ও ডিজিটাল সাক্ষরতায় এখনো অনেক পথ বাকি। সবাইকে সম্পৃক্ত করতে হলে শুধু প্রযুক্তি নয়, মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিশ্বাস অর্জনই এখন সবচেয়ে জরুরি। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/দুপুর/২৯ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 3 months আগে

