অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
সুদহার বাজারভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর থেকে দেশের ব্যাংকিং খাতে ঋণ ও আমানতের সুদহারের ব্যবধান—অর্থাৎ স্প্রেড—নির্বিশেষে বাড়তে শুরু করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চে যেখানে ব্যাংকগুলোর গড় স্প্রেড ছিল ২.৯৬ শতাংশ, ২০২৫ সালের মার্চে তা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫.৮৭ শতাংশে। অথচ কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৪ শতাংশের বেশি স্প্রেডকে অনুমোদনযোগ্য মনে করে না এবং এটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নির্দেশনা দিলেও অধিকাংশ ব্যাংক তা উপেক্ষা করছে।
বর্তমানে বাজারে কার্যত দুটি ধারা তৈরি হয়েছে। প্রথমটি হচ্ছে বিদেশি ও শক্তিশালী বেসরকারি ব্যাংকগুলোর দিক, যারা আমানতের বিপরীতে খুবই কম সুদ (১-২ শতাংশ) দিলেও ঋণের ক্ষেত্রে ১২ শতাংশের বেশি সুদ নিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের সুদহার স্প্রেড এখন ৯.৬৯ শতাংশ, এবং ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের স্প্রেড ৯.৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে। এসব ব্যাংক তাদের অতিরিক্ত স্প্রেডের মাধ্যমে রেকর্ড পরিমাণ মুনাফা করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অন্তত ১০টি ব্যাংক ২০ শতাংশের ওপরে রিটার্ন অন ইকুইটি (RoE) অর্জন করেছে, যা প্রাক-বাজারভিত্তিক সুদহার যুগে ছিল ৮-১২ শতাংশ।
অন্যদিকে দুর্বল ও অনিয়মে জর্জরিত অনেক ব্যাংক এখন আমানত সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছে। তারা ১২-১৪ শতাংশ পর্যন্ত সুদ দিয়েও আমানত টানতে পারছে না, কারণ গ্রাহকদের মধ্যে এসব ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতা ও নিরাপত্তা নিয়ে গভীর সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অনেক আমানতকারী এখন নিরাপদ ব্যাংকে কম সুদে হলেও টাকা রাখছেন, যাতে মূলধনের নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে। এই অবস্থায় দুর্বল ব্যাংকগুলো আমানতের বিপরীতে অতিরিক্ত সুদ দিয়ে মূলধন সংগ্রহ করলেও তা লাভজনকভাবে বিনিয়োগ করতে পারছে না, বরং অনুৎপাদনশীল খাতে ঋণ বিতরণ ও খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এতে করে তারা আরও গভীর আর্থিক সংকটে পড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, কোনো ব্যাংকের স্প্রেড ৪ শতাংশের বেশি হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে দেখা গেছে, বহু ব্যাংক এই নির্দেশনা অমান্য করছে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যকর হস্তক্ষেপ নেই বললেই চলে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বল নজরদারি এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অভাবে বাজারে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে, যা শুধু উদ্যোক্তাদের ঋণগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করছে না, বরং অনেককে উচ্চ সুদের কারণে খেলাপিতে পরিণত করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ২০ শতাংশ। কিন্তু বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং অর্থনীতিবিদদের মতে, প্রকৃত খেলাপির হার ৩০ শতাংশের কাছাকাছি। উৎপাদনশীল খাতে ঋণ প্রবাহ কমে যাওয়ায় নতুন শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উচ্চ সুদের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা না থাকায় অনেক ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) কার্যক্রম বন্ধ বা সীমিত করে ফেলেছেন।
এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন বলেন, “বর্তমানে এমনকি ১৪ শতাংশ সুদেও অনেক উদ্যোক্তা ঋণ পাচ্ছেন না। ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি খরচ, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট—সব মিলিয়ে ব্যবসা পরিচালনা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।” সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্য এবং ইউরোপে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সংকট, এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধিও দেশের ব্যবসায়িক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী নেতারা মনে করছেন, বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা কার্যকর করতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও দৃঢ় ও নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে হবে। বাছবিচারহীনভাবে সুদহার বাড়িয়ে ব্যাংকগুলোর লাভবান হওয়া অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। একদিকে সাধারণ আমানতকারীরা কম সুদ পাচ্ছেন, অন্যদিকে উদ্যোক্তারা ঋণের উচ্চ ব্যয় বহন করতে না পেরে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। ফলে দেশে বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
সুদহার ব্যবস্থার এই বৈষম্যমূলক রূপ শুধু ব্যাংক খাতেই নয়, গোটা অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আর্থিক খাতে ভারসাম্য ও আস্থার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সময়োপযোগী ও কার্যকর নীতিগত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। নতুবা সামনের দিনগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আরও গভীর সংকটে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ●
অকা/প্র/ই/ সকাল/২৫ মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 9 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version