অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

বিশ্ব রাজনীতিতে যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব প্রায়ই দূরবর্তী দেশগুলোর অর্থনীতিতেও গভীরভাবে অনুভূত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রইসরায়েল-এর সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সংঘাত আবারও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে তেলের দামে, যা ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে। এই পরিস্থিতি এমন এক সময়ে তৈরি হয়েছে যখন বাংলাদেশ কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। ফলে নতুন করে আরেকটি মূল্যস্ফীতির ঢেউয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। দেশটি তার প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল এবং রাসায়নিক সার—দুটোরই বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে তার প্রভাব কেবল জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, কৃষি, শিল্প এবং খাদ্যপণ্যের বাজারসহ পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ে, কৃষিক্ষেত্রে সেচ ও সারের দাম বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এই চাপ সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভোগ্যপণ্যের দামে গিয়ে পড়ে।

বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলেছে সাম্প্রতিক যুদ্ধের সময়কাল। প্রায় চার বছর আগে, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি, খাদ্য ও সারের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়েছিল। সেই ধাক্কায় বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক অর্থনীতি তীব্র মূল্যস্ফীতির মুখে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতির হার উচ্চ পর্যায়ে থাকার কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। সেই পরিস্থিতি থেকে পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই আবার নতুন ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্ববাজারকে অস্থির করে তুলেছে।

বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে আন্তর্জাতিক তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি-এর নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই প্রণালিটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ, যার মাধ্যমে প্রতিদিন বিশ্বে সরবরাহ হওয়া মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এই পথ দিয়ে তেল পরিবহন দীর্ঘ সময় ব্যাহত হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে।

সোমবার লেনদেন চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের বেঞ্চমার্ক তেল ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট-এর নিকটতম মেয়াদের ফিউচার প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ১১৮ ডলার ছাড়িয়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুড-এর দামও ২৫ শতাংশের বেশি বেড়ে প্রায় ১১৭ ডলারে পৌঁছেছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটলে দাম আরও বাড়তে পারে বলে বাজার বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন।

এই পরিস্থিতির প্রভাব ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে পড়তে শুরু করেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সরবরাহ অনিশ্চয়তার কারণে তেল উৎপাদন কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর অর্থনীতির জন্য এমন পরিস্থিতি সাধারণত কেবল আন্তর্জাতিক সংবাদ হয়ে থাকে না; বরং তা দ্রুত অভ্যন্তরীণ বাজারেও প্রতিফলিত হয়। অতীতে দেখা গেছে, তেলের দাম বাড়ার খবর ছড়ালেই দেশের বিভিন্ন স্থানে পেট্রোলপাম্পে জ্বালানি কেনার জন্য মানুষের ভিড় বেড়ে যায়। যদিও সরকার বিভিন্ন সময় সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার আশ্বাস দেয়, তবুও সাধারণ মানুষের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয় না।

বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও খুব বেশি স্বস্তিদায়ক নয়। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে, যা গত দশ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার আরও বেশি—প্রায় ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ—যা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ব্যয়কে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

এদিকে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। বর্তমানে মজুরি প্রবৃদ্ধি প্রায় ৮ শতাংশের কিছু বেশি, যার অর্থ হলো আয় বৃদ্ধির গতি মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম। ফলে সাধারণ মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। টানা কয়েক বছর ধরে এই প্রবণতা চলতে থাকায় অনেক পরিবারের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।

ম্যাক্রো অর্থনীতির অন্যান্য সূচকও কিছুটা উদ্বেগের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের পণ্য রপ্তানি কয়েক মাস ধরে কমেছে এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ঐতিহাসিকভাবে নিম্ন পর্যায়ে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়েও বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

মুদ্রা বিনিময় হারও অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। কয়েক বছর আগে যেখানে এক মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য ছিল প্রায় ৮৬ টাকা, বর্তমানে তা বেড়ে ১২২ টাকার বেশি হয়েছে। যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ে, তাহলে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং টাকার ওপর আরও চাপ তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতি নীতিনির্ধারকদের জন্যও একটি জটিল দ্বিধা তৈরি করেছে। একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রাখা প্রয়োজন, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোও জরুরি। নীতিনির্ধারণে এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অনেকাংশেই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ কত দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে তার ওপর। তবে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিবিদদের অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সামনে আবারও মূল্যস্ফীতির একটি কঠিন সময় দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য এটি এমন একটি সংকট, যার বড় অংশই আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল। ফলে আগামী মাসগুলোতে দেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকদের দক্ষতা যেমন বড় পরীক্ষার মুখে পড়বে, তেমনি সাধারণ মানুষের ধৈর্য ও সহনশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

অকা/জ্বা/ই/সকাল/১০ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version