অর্থকাগজ প্রতিবেদন 

জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রফতানিতে গতি ফেরার প্রত্যাশা তৈরি হলেও বাস্তব চিত্র হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বিতীয় মাস মার্চেই বড় ধাক্কা খেয়েছে দেশের রফতানি খাত। সামগ্রিকভাবে এই পতন শুধু স্বল্পমেয়াদি নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চে দেশের মোট রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩.৪৫ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসে ছিল ৪.২৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে রফতানি কমেছে ১৮.০৭ শতাংশ—যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পতন। এর ফলে টানা আট মাস ধরে রফতানিতে নেতিবাচক প্রবণতা অব্যাহত থাকল।

খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, এই পতনের পেছনে তাৎক্ষণিক ও কাঠামোগত—দুই ধরনের কারণই কাজ করেছে। প্রথমত, মার্চে ঈদ উপলক্ষে দীর্ঘ ছুটির কারণে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম প্রায় এক সপ্তাহের বেশি সময় বন্ধ ছিল। দ্বিতীয়ত, মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশেষ করে ইরান-সম্পর্কিত সংঘাত, বৈশ্বিক বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করে ক্রয়াদেশে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।

বাংলাদেশের রফতানির মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচিত তৈরি পোশাক খাত, যা মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি যোগান দেয়, সেই খাতেই প্রায় ২০ শতাংশ পতন হয়েছে। বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু জানিয়েছেন, দীর্ঘ ছুটির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মার্চে প্রত্যাশিত রফতানি সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় নির্বাচনের পর বাজারে ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা ছিল। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা সেই সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক ক্রয়াদেশের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

শিল্প বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরণের টানা নেতিবাচক প্রবণতা বাংলাদেশের পোশাক খাতে বিরল। এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সময় আরোপিত পাল্টা শুল্ক নীতির প্রভাবও এখনো বহাল রয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রইউরোপীয় ইউনিয়ন-এর বাজারে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ক্রেতারা অর্ডার কমিয়ে দিয়েছেন।

অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমার ইঙ্গিত থাকলেও নতুন করে যুদ্ধ পরিস্থিতি তা আবার জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ সৃষ্টি করেছে, যার ফলে তেলের দাম বাড়ছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি একদিকে আন্তর্জাতিক চাহিদা কমাচ্ছে, অন্যদিকে স্থানীয় উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে—যা রফতানিতে দ্বিমুখী চাপ তৈরি করেছে। তিনি শিল্পখাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের হস্তক্ষেপের ওপর জোর দেন।

এদিকে চামড়া খাতেও একই ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি টিপু সুলতান জানান, সাধারণত মার্চ থেকেই শীতকালীন পণ্যের অর্ডার আসা শুরু হয়। কিন্তু এবার যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার কারণে ক্রেতারা সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছেন।

তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হলেও এর অর্থনৈতিক অভিঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা অন্তত এক বছর স্থায়ী হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো-এর ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও চলতি অর্থবছরের শেষ তিন মাসে কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর আশা দেখছেন।

ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, তৈরি পোশাক ছাড়াও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, পাট ও পাটজাত পণ্য, কৃষিপণ্য এবং প্রকৌশল খাত—প্রায় সব প্রধান রফতানি খাতেই পতন দেখা গেছে। ব্যতিক্রম হিসেবে প্লাস্টিক পণ্যের রফতানিতে সামান্য প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।

সামগ্রিকভাবে, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে মোট রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩৫.৩৯ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ কম। এই ধারাবাহিক পতন দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ও অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অকা/প্র/ই/দুপুর/৫ এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 9 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version