অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
আওয়ামী লীগ সরকারের প্রায় সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে দেশের ব্যাংক খাত ব্যাপক দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অনিয়মের শিকার হয়েছে, যার ভয়াবহতা বর্তমানে চরম আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ (২০২৪-২৫ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত) এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্যাংক খাত চারটি প্রধান সূচকে তীব্র চাপের মধ্যে রয়েছে: ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন ঘাটতি এবং নিট আয়ে উল্লেখযোগ্য হ্রাস।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর হিসাব অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচার হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে, এবং অবশিষ্ট প্রায় ২.৫ লাখ কোটি টাকা বিভিন্ন জালিয়াতির মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের কোনো অংশই আজ পর্যন্ত ফেরত আনা সম্ভব হয়নি।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে, প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকা, যা বিগত ১৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এর অর্থ হলো, ব্যাংকগুলো তাদের বিতরণকৃত ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে পারছে না। ফলস্বরূপ, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে এবং ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হওয়ার গভীর আশঙ্কার সম্মুখীন হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন অনুপাতের (CRAR) হার কমে মাত্র ৩.০৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যেখানে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এই হার ন্যূনতম ১০ শতাংশ হওয়া বাধ্যতামূলক। বিশেষভাবে উদ্বেগের বিষয় হলো, সরকার নিয়ন্ত্রিত বেশ কয়েকটি ব্যাংকের কোনো মূলধন অবশিষ্ট নেই। তাদের সমুদয় মূলধনই খেলাপি ঋণের কারণে নিঃশেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে এই ব্যাংকগুলো সম্পূর্ণরূপে সরকারের গ্যারান্টি এবং বাজেট-ভিত্তিক মূলধন সরবরাহের উপর নির্ভরশীল।
২০২৫ সালের মার্চ মাসে ব্যাংকগুলোর সম্পদ থেকে অর্জিত আয় গত ১৮ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে—প্রতি ১০০ টাকায় আয় মাত্র ২৩ পয়সা। যদিও ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে এই আয় কিছুটা বেড়ে ০.৩৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল, তবে সামগ্রিক প্রবণতা এটাই নির্দেশ করে যে ব্যাংকগুলোর মৌলিক আয় generation ক্ষমতা বর্তমানে তলানিতে ঠেকেছে।
দুর্বল ব্যাংকগুলো তাদের গ্রাহকদের আমানতের অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় ব্যাপক আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এই ব্যাংকগুলো দৈনন্দিন আমানতের তুলনায় উত্তোলনকারীদের চাহিদা মেটাতে পারছে না, যার ফলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অন্যান্য ব্যাংকের কাছ থেকে ধার নিতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ব্যাংকিং খাতে তারল্য প্রবাহকে ব্যাহত করছে এবং ঋণ বিতরণের সক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে।
ব্যাংকিং খাতের এই গভীর সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত সংস্কারের পথে হাঁটছে। ২০২৪ সালের শেষদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১১টি দুর্বল ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছে এবং সম্পদের গুণমান যাচাই (Asset Quality Review) প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন নীতিমালা জারি করাও এই উদ্যোগের অংশ।
দুর্বল ব্যাংকগুলোকে টিকিয়ে রাখার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীভূতকরণের (Merger) পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ‘ব্যাংক একীভূতকরণ আইন’-এর একটি খসড়া তৈরি করেছে, যার মাধ্যমে কয়েকটি ছোট ও সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে বড় ব্যাংকের সাথে একীভূত করা হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, দেশের ব্যাংক খাত বর্তমানে যে চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন, তা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পূর্ণ স্বাধীনতা, একটি জবাবদিহিতামূলক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং বিচারিক কাঠামোর শক্তিশালী প্রয়োগ। শুধুমাত্র কাগজে-কলমে সংস্কার নয়, বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই খাতকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব। ●
অকা/ব্যাংখা/দুপুর/ ১২ মে, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 10 months আগে

