অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণের ফলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির গতি স্পষ্টতই মন্থর হয়ে পড়েছে। চাহিদা সংকোচন, উচ্চ সুদহার এবং বিনিয়োগে অনিশ্চয়তার প্রভাব এখন উৎপাদন ও কর্মসংস্থানে পড়ছে। একই সময়ে নিম্নমানের কর আদায়, ঊর্ধ্বমুখী মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের বিস্তার এবং প্রাতিষ্ঠানিক শাসনব্যবস্থার দুর্বলতা মিলিয়ে অর্থনীতি এক জটিল চাপের মুখে। বাস্তব মজুরি সমন্বয় না হওয়ায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, ফলে ভোগব্যয়ও সংকুচিত হচ্ছে—যা আবার সামগ্রিক প্রবৃদ্ধিকে আরও নিচের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে। কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। কর অব্যাহতির বিস্তৃত কাঠামো, করফাঁকি ও প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে রাজস্ব আহরণ সম্ভাবনার তুলনায় কম। ফলত বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশি ও বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। উচ্চ সুদে ধার নিয়ে পূর্বের ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে—যা এক ধরনের ‘ঋণ-চক্রের’ ঝুঁকি তৈরি করছে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার নোটে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা, ঝুঁকি ও নীতি-অগ্রাধিকারের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরেছেন। প্রতিবেদনে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বাজারব্যবস্থায় আস্থা পুনরুদ্ধার এবং রাজস্ব সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বিশেষভাবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাঠামোগত সংস্কার, কর অব্যাহতির পুনর্মূল্যায়ন, আয়কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন এবং কাস্টমস আধুনিকায়নের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ভ্যাট অটোমেশন ও ই-ইনভয়েস চালুর মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকি কমানোর পরিকল্পনাও গুরুত্ব পেয়েছে।
রাজনৈতিক পালাবদলের প্রাক্কালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নতুন অর্থমন্ত্রী দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন। শপথের সঙ্গে সঙ্গেই অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টার দায়িত্ব শেষ হবে। বিদায়ী পর্যায়ে উপদেষ্টা উল্লেখ করেছেন, নতুন করে কর্মসূচি শুরুর বদলে চলমান সংস্কার প্রক্রিয়াকে ধারাবাহিক ও শক্তিশালী করাই হবে অধিক ফলপ্রসূ কৌশল।
ব্যাংকিং খাতের চিত্র প্রতিবেদনে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হিসেবে উঠে এসেছে। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ (সিপিডি)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছরে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৯২ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে। বর্তমানে বিতরণকৃত মোট ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। এতে ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি বেড়েছে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়েছে।
গত সেপ্টেম্বর শেষে আমানত ও ঋণের সুদহার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যথাক্রমে ০.৫৮ এবং ০.৪৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। ঋণের সুদহার ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হলেও খেলাপি ঋণ ও দুর্বল সুশাসনের সমস্যা রয়ে গেছে। সামষ্টিক অনিশ্চয়তার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি গত নভেম্বরে আগের বছরের তুলনায় ৬.৫৮ শতাংশ কমেছে—যা বিনিয়োগ ও শিল্প সম্প্রসারণে নেতিবাচক সংকেত।
অন্তর্বর্তী সরকার ব্যাংক ও আর্থিক খাত পুনর্গঠনে একাধিক আইন সংশোধন ও প্রণয়ন করেছে। ব্যাংক কোম্পানি আইন (সংশোধন), ফিন্যান্স কোম্পানি আইন, সিকিউরড ট্রানজেকশন আইন, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্ট এবং অর্থ ঋণ আদালত আইন সংশোধনের পাশাপাশি আমানত সুরক্ষা ও ব্যাংক রেজুলেশন অধ্যাদেশ কার্যকর করা হয়েছে। বিশেষভাবে ব্যাংক রিসলিউশন অর্ডিন্যান্স ২০২৫-এর মাধ্যমে সংকটাপন্ন ব্যাংকে দ্রুত হস্তক্ষেপের পূর্ণ ক্ষমতা পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর অধীনে গঠিত ব্যাংক রিসলিউশন ইউনিট ইতোমধ্যে পাঁচটি ইসলামী ব্যাংক একীভূত করে অস্থায়ী প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। তবে এ প্রক্রিয়ায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হচ্ছে—যা রাজস্ব চাপে থাকা অর্থনীতির জন্য বড় বোঝা।
সামষ্টিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে তাৎক্ষণিকভাবে নিত্যপণ্যের আমদানি ব্যবস্থাপনা, বাজার তদারকি জোরদার, সরবরাহ চেইনের জটিলতা নিরসন এবং সমন্বিত রাজস্ব ও মুদ্রানীতি অনুসরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির ফলে আগামী জুন নাগাদ মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের কাছাকাছি নেমে আসবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে নেমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈদেশিক খাতেও মিশ্র চিত্র দেখা যাচ্ছে। আমদানির প্রবৃদ্ধি কিছুটা বাড়লেও রপ্তানিতে গতি কমেছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে প্রত্যাশিত উৎপাদন না হওয়ায় সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি চাপে পড়েছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সার্বিকভাবে অর্থনীতি এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক খাত সংস্কারের প্রয়াস ইতিবাচক হলেও রাজস্ব ঘাটতি, ঋণচাপ ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা মোকাবিলায় কার্যকর নীতি-সমন্বয় এবং শক্তিশালী সুশাসন ছাড়া টেকসই পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। নতুন অর্থমন্ত্রীর সামনে চ্যালেঞ্জ কেবল প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার নয়, বরং অর্থনীতির ভিতকে পুনর্গঠন করে আস্থা ফিরিয়ে আনা। ●
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 17 hours আগে

