তারেক আবেদীন ●
সংস্কারের অংশ হিসেবে দেশের বীমা খাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে তৎপর হয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)। শক্ত অবস্থানে দেশের বীমা খাতের নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান আইডিআরএ।
জানা গেছে, অতীতে অনিয়ম ও অবৈধভাবে যেসব কোম্পানি ব্যবসা পরিচালনা করেছে তাদেরও কোন প্রকার ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। সুশাসনের আওতায় বীমা কোম্পানিগুলো নিয়ে আসার উদ্যোগী হয়েছে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, বীমা কোম্পানিতে কর্মরত সিইওর দাখিলকৃত ভূয়া শিক্ষা সনদ এবং সময়কালের অযোগ্যতায় দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী ৮ জন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে বাদ দেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া শুরু হয়েছে। আইডিআরএ সংশ্লিষ্ট কোম্পানি অনেককে জরিমানাও করেছে। ২ মাস সময়ের মধ্যে যোগ্য নতুন মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগদানের জন্য কোম্পানির চেয়ারম্যান বরাবর আইডিআরএ চিঠি পাঠিয়েছে। জানা গেছে, আইডিআরএ’র এ ধরনের শুদ্ধি অভিযান চলবে। শুদ্ধি অভিযানের তালিকায় ব্যবসায়ে আলোচিত ও সমালোচিত চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি জীবন বীমা কোম্পানি সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর নামও রয়েছে বলে আইডিআর’র নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি জীবন বীমা কোম্পানি গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডকে ৫ লাখ জরিমানা করে ২৭ জানুয়ারি চিঠি পাঠিয়েছে আইডিআরএ। গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর চেয়ারম্যানকে লিখিত ৫৩.০৩.০০০০.০৩২.১১.০০২.২১.১৮ স্মারক নম্বরের সে পত্রে বলা হয়, গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রায় ৪ বছর ধরে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগ না দিয়ে বীমা আইন ২০১০ এর ৮০ ধারা লংঘন করেছে। জরিমানার টাকা ১৫ দিনের মধ্যে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর নামে ব্যাংক পে অর্ডারের মাধ্যমে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়। আগামী ৬০ দিনের মধ্যে কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়। তা না করা হলে পুনরায় ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে বলে আইডিআরএ থেকে কোম্পানিকে জানানো হয়।
উল্লেখ্য, বিশিষ্ট বীমাবিদ বেঙ্গল ইসলামি লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এম এম মনিরুল আলম চতুর্থ প্রজন্মের দেশের বেসরকারি জীবন বীমা কোম্পানি গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এর নির্বাহী প্রধান ছিলেন। দক্ষ ও সুচারু পরিচালনার মাধ্যমে তিনি কোম্পানিটিকে মানসম্পন্ন ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যান। দুই মেয়াদে ২০১৫ সাল থেকে ২০২০ অবধি অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তিনি ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর কোম্পানি থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর কোম্পানিটির প্রধান হিসাব কর্মকর্তা শেখ রাকিবুল করিম এফসিএকে ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২ দিন পর অর্থাৎ ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি তাকে উপ ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়। সে সময় বিদ্যমান আইনে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার অব্যবহিত নিম্নপদে অবস্থান এবং বীমা কোম্পানিতে অভিজ্ঞতার যোগ্যতা কোনটাই শেখ রাকিবুল করিমের ছিল না। মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে কোম্পানির পর্ষদ সহায়তায় ৬ মাসের অধিক প্রায় ৪ বছর আইন বর্হিভূতভাবে গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড এ ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখেন তিনি। সংবাদপত্রকে তিনি এড়িয়ে চলতেন। কোন কোন ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশ অমান্য করারও অভিযোগ ছিল তার বিরুদ্ধে!
দীর্ঘ সময় চতুর্থ প্রজন্মের বেসরকারি জীবন বীমা কোম্পানি আকিজ তাকাফুল লাইফ ইন্স্যুরেন্স পিএলসি এর চলতি দায়িত্বে থাকা মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলমগীর চৌধুরীর নিয়োগ প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছে আইডিআরএ ৯ জানুয়ারি। নিয়োগ প্রস্তাব নাকচের কারণ হিসেবে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে উল্লেখ করা হয় প্রতারণার মাধ্যমে মোহাম্মদ আলমগীর চৌধুরীর দাখিলকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ সংগৃহীত হয়েছে। কোম্পানিটির চেয়ারম্যানকে লিখিত চিঠিতে (স্মারক নম্বর-৫৩.০৩.০০০০.০৩২.১১.০০২.২২.৭) আড়াই মাস আগে কোম্পানিটির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার অব্যবহিত নিম্নপদে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কর্মকর্তাকে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। আইডিআরএ’র নিয়োগ প্রস্তাব নাকচের বিরুদ্ধে মোহাম্মদ আলমগীর চৌধুরী সম্প্রতি উচ্চ আদালতে একটি রীট আবেদন (১৬২১১/২০২৪) করেছেন বলে অর্থকাগজকে জানান।
সূত্র জানায়, অবৈধভাবে যত্রতত্র শাখা ও বুথ খুলে বেশ কটি নন লাইফ বীমা কোম্পানি ব্যবসায় পরিচালনা করছে এ মর্মে সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের সূত্র ধরে নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান এর সত্যতার প্রমাণ পায়। অনিয়ম রোধে শুদ্ধি অভিযানের ধারাবাহিকতায় অতি সম্প্রতি বেশ কটি নন লাইফ বীমা কোম্পানিকে এ ব্যাপারে সতর্ক করে দেওয়া হয়। কোম্পানিগুলো হচ্ছে - ইসলামী কমার্শিয়াল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড, ইস্টার্ন ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড, ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড, স্ট্যান্ডার্ড ইন্স্যুরেন্স লিমিটেড, রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড, রূপালী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড ও সাউথ এশিয়া ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে চট্টগ্রামের দুটি কোম্পানি এন মোহাম্মদ ট্রেডিং করপোরেশন এবং এস এস ট্রেডিং করপোরেশনের ১২৫ কোটি ৩৪ লাখ ৬০০ টাকার সম্পদের বীমা করে প্রাইম ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড। বীমার মূল্য ১২৫ কোটি টাকা। কিন্তু ওই সম্পদের পুনর্বীমা করার ক্ষেত্রে তারা আশ্রয় নেয় অনিয়মের। সেই অনিয়ম ধরা পড়ায় ১৩ জানুয়ারি কোম্পানিটিকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ড. এম. আসলাম আলম অর্থকাগজকে বলেছেন, বীমা শিল্পেও সৎ, শিক্ষিত ও যোগ্য নির্বাহীর বিকল্প নেই। বিগত সময়ে অনেক অনিয়ম হয়েছে এ খাতে। ফলে বীমা কোম্পানিগুলোর প্রতি আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। প্রভাব খাটিয়ে কাঁচা পয়সায় অযোগ্যদের কোম্পানি পরিচালনার বসানো হয়েছে। যোগ্যদের মূল্যায়ন করা হয়নি। ফলে ভালো কর্মী সৃষ্টি হয়নি এ খাতে। জবাবদিহিতা যেমন ছিল না; তেমনি প্রতিষ্ঠিত হয়নি সুশাসন। তিনি বলেন, প্রশাসন সুচারুভাবে পরিচালনা করার বিকল্প নেই। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কোম্পানিগুলোকে কোন ধরনের অনুরোধ করব না। তাই সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব হবে বলে মনে করছি।
লাইফ ও নন লাইফের বেশ কটি বীমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার ভূয়া ও বিতর্কিত শিক্ষা সনদ বিদ্যমান। নিকট অতীতে নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের দুর্নীতিবাজ কজন কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করে বীমা কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক/মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা পদ অনুমোদন করিয়ে নিয়েছেন। এরমধ্যে প্রথম প্রজন্মের একটি বীমা প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। নিয়ন্ত্রকের দফতরে ভূয়া শিক্ষা সনদ জমা দিয়ে দ্বিতীয় প্রজন্মের জীবন বীমা কোম্পানি হোমল্যান্ড লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা আজিজুল হক তালুকদার প্রায় ১১ বছর এমডির দায়িত্ব পালন করে গেছেন। কোম্পানিতে তার সময়ে সংঘটিত বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাখ্যা চেয়ে কদিন আগে চিঠি দিয়েছে আইডিআরএ। কোম্পানিটির বর্তমান ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) শিক্ষা সনদও বিতর্কিত! মার্কেন্টাইল ইসলামী লাইফ লিমিটেড এর সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা এবং বর্তমান প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনসিওরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এর সিইওর শিক্ষা সনদেও বিতর্ক রয়েছে। ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড এ সদ্য যোগদানকারী মুখ্য নির্বাহী শিক্ষা সনদ জালিয়াতির কারণে বীমা পাড়ায় তিনি বেশ আলোচিত! বীমা কোম্পানির অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য ও উপাত্ত এবং দালিলিক প্রমাণপত্রসহ ব্যবস্থাপনা পরিচালক/মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার ভূয়া শিক্ষা সনদ, বছরের পর বছর অনিয়মিত এমডি, বয়সসীমা ও অভিজ্ঞতার অযোগ্যতা সংক্রান্ত বিষয়ে অর্থকাগজ ২৫ বছরে কয়েক শ’ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অর্থকাগজ অনলাইন পোর্টালে এসব বিষয়ে ১৭টি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় সাম্প্রতিককালে। বীমা খাতের নিয়ন্ত্রক সময় নিয়ে তা খতিয়ে দেখে। তাতে সত্যতার প্রমাণ পায়।
জানা গেছে, বিগত ১৫ বছরে দেশের বীমা কোম্পানিতে মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে বছরের পর বছর সিসি (চলতি দায়িত্ব) হিসেবে কাজ করা, নূন্যতম বয়সের কম বয়সী প্রধান নির্বাহীর পদে থাকা এবং ভূয়া শিক্ষা সনদে বীমা কোম্পানির এমডিরা ছিলেন। এর বেশির ভাগই চতুর্থ প্রজন্মের কোম্পানির। এখনও তা বিদ্যমান। এদের ব্যাপারেও আইডিআরএ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত সোনালী লাইফের ভারপ্রাপ্ত সিইওর নামও এ তালিকায় রয়েছে।
বীমা কোম্পানিতে সিইও পদে অনুমোদনপ্রাপ্ত ভূয়া শিক্ষা সনদধারী ও অযোগ্যদের ব্যাপারে কি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে প্রশ্নের উত্তরে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ এর লাইফ বীমার দায়িত্বে কর্মরত অভিজ্ঞ পদস্থ একজন কর্মকর্তা অর্থকাগজকে জানান, এ ধরনের কর্মকর্তাগণ পুনঅনুমোদন পাচ্ছেন না।
বীমা কোম্পানিতে অযোগ্য বলে বিবেচিত মুখ্য নির্বাহীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই অফিসে অনুপস্থিত থাকছেন। যোগাযোগ থেকে অনেকটা বিরত রয়েছেন তারা। কিভাবে পদে বহাল থাকা; সরকারের পক্ষে আইডিআরএ’র জরিমানা মওকুফ করা এবং অন্যায় ঠেকাতে কিভাবে ‘ম্যানেজ’ করা যায় এ নিয়ে তারা ব্যস্ত বলে অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে। ●
অকা/বীখা/বিপ্র/সন্ধ্যা/৩ ফেব্রুয়ারি/২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 year আগে

