মুনতাসীর মামুন>
বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ দমনে একসময় ধারাবাহিক সাফল্যের নজির থাকলেও বর্তমানে পালিয়ে থাকা জঙ্গি সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিটগুলো। সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা বিশ্লেষক, গোয়েন্দা পর্যবেক্ষণ এবং সাম্প্রতিক অভিযানের তথ্য বলছে, লোকবল সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের ঘাটতি এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বয় দুর্বল হওয়ায় পলাতক উগ্রপন্থিদের খুঁজে বের করা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে।
একই সঙ্গে নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট মহলে আশঙ্কা বাড়ছে, পুরোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সদস্যদের পাশাপাশি নতুন নামে ছোট ছোট উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে। এসব নেটওয়ার্কের বড় অংশই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, এনক্রিপটেড মেসেজিং অ্যাপ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সদস্য সংগ্রহ ও মতাদর্শ প্রচারে সক্রিয় বলে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
পলাতক জঙ্গিদের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক অভিযানে বিভিন্ন সময়ে শীর্ষ জঙ্গি নেতা ও সদস্য গ্রেপ্তার হলেও এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ মামলার আসামি পলাতক রয়েছে।
এসব পলাতক সদস্য দেশের ভেতরে আত্মগোপনে থাকার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী এলাকা কিংবা বিদেশ থেকেও যোগাযোগ রক্ষা করতে পারে। তাদের অনেকেই ভুয়া পরিচয়, ডিজিটাল পরিচয় পরিবর্তন এবং এনক্রিপটেড যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নজরদারি এড়িয়ে যাচ্ছে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা
সাবেক ও বর্তমান নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী—
- উন্নত ফেসিয়াল রিকগনিশন নেটওয়ার্কের সীমিত ব্যবহার।
- জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত বায়োমেট্রিক ও ট্রাভেল ইন্টেলিজেন্স বিশ্লেষণের ঘাটতি।
- ডিজিটাল ফরেনসিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা।
- সাইবার নজরদারির জন্য পর্যাপ্ত বিশেষজ্ঞের অভাব।
এসব কারণে অনলাইনভিত্তিক উগ্রবাদী কার্যক্রম শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
লোকবল সংকটের প্রভাব
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গিবাদ দমনে নিয়োজিত বিশেষায়িত ইউনিটগুলোকে বর্তমানে সন্ত্রাসবাদ ছাড়াও সাইবার অপরাধ, সংঘবদ্ধ অপরাধ, আন্তর্জাতিক অপরাধ, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা এবং বিভিন্ন বিশেষ দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
ফলে শুধুমাত্র জঙ্গিবাদবিরোধী গোয়েন্দা নজরদারিতে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োজিত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বিভিন্ন সংবাদ বিশ্লেষণেও উল্লেখ করা হয়েছে, বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর একটি অংশ এখন বহুমুখী দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত থাকায় জঙ্গিবাদবিরোধী কার্যক্রমে চাপ তৈরি হয়েছে।
নতুন সংগঠনের উত্থান
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে বড় সংগঠনের পরিবর্তে ছোট ছোট "সেলভিত্তিক" কাঠামো গড়ে উঠছে।
এই নেটওয়ার্কগুলো—
- অনলাইনে নিয়োগ দেয়
- ভার্চুয়াল প্রশিক্ষণ পরিচালনা করে
- ছোট গ্রুপে সাংগঠনিক কার্যক্রম চালায়
- বিদেশি উগ্রবাদী মতাদর্শ অনুসরণ করে।
এর আগে এটিইউ নতুন উদীয়মান কয়েকটি জঙ্গি নেটওয়ার্কের সদস্যদের গ্রেপ্তারের তথ্য প্রকাশ করেছে।
নিষিদ্ধ ও সক্রিয় সংগঠন
তবে বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে আলোচিত ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে থাকা সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)
- নব্য জেএমবি
- আনসার আল ইসলাম
- আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)
- হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি)
- হিযবুত তাহরীর
- আল্লাহর দল
- শাহাদাত-ই-আল হিকমা
- জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (JMJB)
- আনসার ফি আল বাংলা
- তাওহিদী জনতা
- আল-কায়েদা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাবকন্টিনেন্ট (AQIS)
- ইসলামিক স্টেট (আইএস) বাংলাদেশে সরাসরি সাংগঠনিক উপস্থিতি নিয়ে সরকারি অবস্থান ভিন্ন, তবে আইএস-অনুপ্রাণিত সেল শনাক্তের দাবি এসেছে বিভিন্ন তদন্তে।
বাংলাদেশে নিষিদ্ধ ঘোষিত উল্লেখযোগ্য সংগঠন
- হিযবুত তাহরীর
- জামাআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)
- আনসারুল্লাহ বাংলা টিম (এবিটি)
- আল্লাহর দল
- শাহাদাত-ই-আল হিকমা
- হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ (হুজি-বি)
- জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (JMJB)
অন্যান্য উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক।
তবে বর্তমানে "দেশে ২০টি সক্রিয় ও ৭টি নিষিদ্ধ সংগঠন"—এমন সংখ্যার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা বাংলাদেশ পুলিশের সর্বশেষ প্রকাশ্য কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকা পাওয়া যায়নি। তাই এ সংখ্যাটি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞরা
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, জঙ্গিবাদ এখন আর শুধু অস্ত্রের লড়াই নয়; এটি তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার স্পেস এবং মতাদর্শিক প্রভাব বিস্তারের লড়াই।
তাদের মতে জরুরি ভিত্তিতে আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নজরদারি, সমন্বিত জাতীয় ডেটাবেস, আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সহযোগিতা, অনলাইন উগ্রবাদ প্রতিরোধে বিশেষ ইউনিট এবং দক্ষ সাইবার বিশ্লেষক নিয়োগ বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে নতুন প্রজন্মভিত্তিক উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক মোকাবিলা আরও কঠিন হতে পারে।
বাংলাদেশ গত এক দশকে বড় ধরনের জঙ্গি হামলা প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। তবে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, হামলা না হওয়া মানেই হুমকি শেষ হয়ে গেছে—এমনটি ধরে নেওয়া উচিত নয়। পরিবর্তিত কৌশল, অনলাইন সংগঠন, ছোট সেলভিত্তিক নেটওয়ার্ক এবং পলাতক সদস্যদের পুনর্গঠন প্রচেষ্টা বিবেচনায় রেখে বিশেষায়িত ইউনিটগুলোর সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 hours আগে

