রুনা হোসেন>

আজ বিশ্বজুড়ে বন্ধুত্ব উদ্‌যাপনের দিন। বাংলাদেশে প্রতি বছর আগস্টের প্রথম রোববার পালিত হয় বন্ধু দিবস, আর জাতিসংঘ ৩০ জুলাইকে স্বীকৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব দিবস হিসেবে। ক্যালেন্ডারের তারিখ ভিন্ন হলেও এই উদ্‌যাপনের মূল বার্তা একটাই—মানুষের জীবনে বন্ধুত্বের মতো নির্মল, স্বাধীন ও নির্ভরতার সম্পর্ক খুব কমই আছে।

মারিও পুজো লিখেছিলেন, “Friendship is everything. Friendship is more than talent. It is more than the government. It is almost the equal of family.” কথাটি হয়তো কিছুটা অতিরঞ্জিত মনে হতে পারে, কিন্তু যার জীবনে অন্তত একজন সত্যিকারের বন্ধু আছে, তার কাছে এর সত্যতা অস্বীকার করা কঠিন। আলবার্ট আইনস্টাইনের ভাষায়, সত্যিকারের বন্ধুত্ব সত্যিকারের ভালোবাসার চেয়েও বিরল।

মানুষ পৃথিবীতে আসে নানা সম্পর্কের মধ্যে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই সে মা-বাবা, ভাই-বোন, আত্মীয়স্বজনের ভালোবাসায় ঘেরা পড়ে। এসব সম্পর্কের অধিকাংশই জন্মসূত্রে পাওয়া। কিন্তু জীবনের কোনো এক মোড়ে এসে আমরা নিজেরাই একটি সম্পর্ক বেছে নিই। সেখানে রক্তের বন্ধন নেই, আইনের চুক্তি নেই, সামাজিক বাধ্যবাধকতাও নেই। আছে শুধু বিশ্বাস, আস্থা, গ্রহণযোগ্যতা এবং নির্ভরতা। সেই সম্পর্কের নাম বন্ধুত্ব।

বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য এখানেই যে এটি অর্জন করতে হয়, উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া যায় না। হয়তো একই বেঞ্চে বসতে বসতে, একই মাঠে খেলতে খেলতে, একই বই পড়তে পড়তে কিংবা জীবনের কোনো সংকটের মুহূর্তে দুজন মানুষ একে অপরের কাছে হয়ে ওঠে সবচেয়ে আপন। ধীরে ধীরে এমন এক সময় আসে, যখন সেই মানুষটিকে ছাড়া নিজের জীবনের গল্পই যেন অসম্পূর্ণ মনে হয়।

দর্শন, সাহিত্য ও শিল্পের ইতিহাসে বন্ধুত্ব তাই বারবার ফিরে এসেছে। প্রাচীন গ্রিসের এরিস্টটল বন্ধুকে বলেছিলেন মানুষের ‘অন্য এক সত্তা’। তার মতে, সুখী জীবনের অন্যতম শর্তই হলো প্রকৃত বন্ধুত্ব। তিনি বন্ধুত্বকে তিন ভাগে ভাগ করেছিলেন—স্বার্থের বন্ধুত্ব, আনন্দের বন্ধুত্ব এবং গুণ বা চরিত্রের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা বন্ধুত্ব। এই শেষেরটিকেই তিনি সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও মূল্যবান বলে মনে করতেন।

রোমান দার্শনিক সিসেরো বিশ্বাস করতেন, সত্যিকারের বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো সততা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নৈতিক সামঞ্জস্য। আর ফরাসি দার্শনিক মিশেল দ্য মনটেইনের বিখ্যাত প্রশ্ন—“আমি তাকে ভালোবাসি কেন?”—এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন, “কারণ সে সে-ই, আর আমি আমি।” অর্থাৎ প্রকৃত বন্ধুত্বের সব ব্যাখ্যা যুক্তি দিয়ে শেষ করা যায় না।

বাংলা সাহিত্য ও বিশ্বসাহিত্যও একই সত্যকে নানা রূপে তুলে ধরেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘বন্ধুত্ব ও ভালোবাসা’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ভালোবাসা অনেক সময় সাজানো-গোছানো, কিন্তু বন্ধুত্ব অনেক বেশি সহজ, স্বাভাবিক ও দৈনন্দিন। বন্ধুত্বে ছোটখাটো অভিমান, অসম্পূর্ণতা কিংবা অগোছালো মুহূর্তও সম্পর্ককে নষ্ট করে না। বরং সেসবই বন্ধুত্বকে আরও মানবিক করে তোলে।

চলচ্চিত্রেও বন্ধুত্বের অসংখ্য স্মরণীয় উদাহরণ রয়েছে। ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস’-এ যখন ফ্রোডো রিংয়ের অসহনীয় ভারে ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন তার বন্ধু স্যাম বলে, “আমি তোমার বোঝা বহন করতে পারব না, কিন্তু তোমাকে বহন করতে পারব।” এই একটি সংলাপই বন্ধুত্বের সবচেয়ে গভীর সংজ্ঞাগুলোর একটি হয়ে আছে। কারণ সত্যিকারের বন্ধু সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারে না, কিন্তু সংকটের সময়ে মানুষটিকে একা ফেলে যায় না।

আবার সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’-এ দেখা যায়, সমাজ যাদের অযোগ্য ভেবে নির্বাসিত করেছিল, তারাই একে অপরের মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গীকে। ‘হীরক রাজার দেশে’ সেই বন্ধুত্ব শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নৈতিক শক্তিতেও পরিণত হয়। অন্যদিকে ‘পথের পাঁচালী’-তে অপু ও দুর্গার ভাইবোনের সম্পর্কের মধ্যে যে বন্ধুত্ব, দুষ্টুমি আর পৃথিবীকে একসঙ্গে আবিষ্কারের আনন্দ রয়েছে, তা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—বন্ধুত্ব কেবল সমবয়সীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

আসলে বন্ধুত্বের কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই, লিঙ্গ নেই, পেশা নেই, সামাজিক অবস্থানও নেই। একজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী, বাবা ও ছেলে, মা ও মেয়ে, সহকর্মী কিংবা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও বন্ধুত্ব জায়গা করে নিতে পারে। যে পরিবারে বাবা-মা সন্তানের বন্ধু হয়ে ওঠেন, সেখানে ভয়ের বদলে জন্ম নেয় বিশ্বাস। যে কর্মস্থলে সহকর্মীরা একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে বন্ধু হতে পারেন, সেখানে কাজের পরিবেশও হয়ে ওঠে অনেক বেশি মানবিক।

ডিজিটাল যুগে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা অনেকটাই বদলে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদের শত শত, কখনো হাজার হাজার ‘ফ্রেন্ড’ থাকে। কিন্তু তালিকার সেই দীর্ঘ নামগুলোর মধ্যে কজন আছেন, যাকে মাঝরাতে কোনো সংকটে ফোন করা যায়? কজন আছেন, যিনি আমাদের সাফল্যে আন্তরিকভাবে আনন্দিত হন কিংবা ব্যর্থতার সময়ে নিঃশব্দে পাশে এসে দাঁড়ান? প্রযুক্তি যোগাযোগকে সহজ করেছে, কিন্তু প্রকৃত বন্ধুত্বের গভীরতা তৈরি করার কাজ এখনো মানুষের হৃদয়কেই করতে হয়।

বন্ধুত্ব মানে সব বিষয়ে একমত হওয়া নয়। বরং মতের ভিন্নতা সত্ত্বেও সম্পর্কটিকে টিকিয়ে রাখার পরিপক্বতাই প্রকৃত বন্ধুত্বের পরিচয়। যে বন্ধু প্রয়োজন হলে ভুল ধরিয়ে দেয়, সাফল্যে অহংকারে ভাসতে দেয় না, আবার ব্যর্থতার সময় হাত ছেড়ে চলে যায় না—সেই বন্ধুই জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। তাইতো বন্ধুত্বের জয় হোক!

সর্বশেষ হালনাগাদ 2 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version