অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
রান্নার লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সংকট জানুয়ারি মাস পেরিয়েও কাটার কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত নেই। বরং বড় ধরনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া না হলে ফেব্রুয়ারির শুরুতেও সরকারকে এলপিজি সরবরাহ নিয়ে চরম চাপে পড়তে হতে পারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলতি জানুয়ারিতে দেশে এলপিজির মোট চাহিদা দেড় লাখ টনের বেশি হলেও এখন পর্যন্ত আমদানি নিশ্চয়তা মিলেছে মাত্র প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টনের। অর্থাৎ শুরু থেকেই ৩০ হাজার টনের বেশি ঘাটতি নিয়ে মাস চলছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, ঘাটতি পূরণে ব্যবসায়ীরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো—চাহিদা ও সরবরাহের এই ফাঁক খুব সহজে পূরণ হওয়ার মতো নয়।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশের (লোটাব) সভাপতি আমিরুল হক জানিয়েছেন, রান্নার গ্যাসের সংকট কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকেই সবাই এলপিজি আমদানির চেষ্টা করছে, কিন্তু সেখানে জাহাজ সংকট, উচ্চ ভাড়া ও সরবরাহকারীদের অনিশ্চয়তা বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংকট মোকাবিলায় সরকার সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ফিলিপাইনের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে। তবে এসব দেশ থেকে এলপিজি আনতে সময় লাগবে। জ্বালানি সচিব সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, সরকারিভাবে প্রায় ১ লাখ টন এলপিজি আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু সেটি বাস্তবে দেশে পৌঁছাতে মার্চ মাস লেগে যেতে পারে। ফলে জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি মিলিয়ে এলপিজির বাজার স্বস্তিতে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। অনেক জায়গায় এখনো সহজে এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে বিইআরসি নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৩০৫ টাকা হলেও বাস্তবে ভোক্তাদের গুনতে হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত। এই অতিরিক্ত ব্যয় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের রান্নার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার বিদ্যুৎচালিত চুলা বা মাটির চুলার মতো বিকল্পে ঝুঁকছে, যা জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ওপর নতুন চাপ তৈরি করছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই সংকট শুধু বাজারগত নয়, নীতিগত ও বৈশ্বিক বাস্তবতার ফল। তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি ও আগাম প্রস্তুতির অভাবের পাশাপাশি ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছিল ১৬ লাখ ১০ হাজার টন, কিন্তু ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৪ লাখ ৬৫ হাজার টনে। অথচ একই সময়ে পাইপলাইনে প্রাকৃতিক গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। লোটাবের হিসাবে, মোট এলপিজি চাহিদার প্রায় ৩০ শতাংশই এখন শিল্প খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে বড় কয়েকটি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের কার্যত অচল হয়ে পড়ায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বেক্সিমকোসহ পাঁচটি বড় কোম্পানি এলপিজি আমদানি করতে পারছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার কারণে ব্যাংকগুলো এসব প্রতিষ্ঠানের এলসি খুলছে না। অথচ এই পাঁচ কোম্পানির যে বিপুল চাহিদা ছিল, তা অন্য আমদানিকারকরা পূরণ করতে পারেনি। এর পাশাপাশি চীনসহ কয়েকটি দেশ আগে ইরান থেকে এলপিজি আমদানি করত। কিন্তু ইরানে টানা বিক্ষোভের কারণে সেই সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চীন স্পট মার্কেটের দিকে ঝুঁকলে বাংলাদেশও একই বাজারে প্রতিযোগিতায় পড়ে যায়। এর ওপর ইরানের গ্যাস পরিবহণের অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ২২টি জাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় বৈশ্বিকভাবে এলপিজি পরিবহণ জাহাজের সংকট আরও বেড়েছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যানের মতে, বাংলাদেশের বড় সমস্যা হলো ছোট আকারের জাহাজে এলপিজি কেনার চেষ্টা। যেখানে চীনসহ বড় দেশগুলো একসঙ্গে এক লাখ টন বা তার বেশি পরিমাণ এলপিজি কিনে নিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ১০ থেকে ২০ হাজার টনের অর্ডার দিচ্ছেন। ফলে বিক্রেতারা বড় ক্রেতাদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তিনি জানান, গত এক সপ্তাহে এলপিজি নিয়ে সব অংশীজনের সঙ্গে একাধিক বৈঠক হয়েছে, এমনকি যেসব কোম্পানি আমদানি করতে পারছে না, তাদের সঙ্গেও আলোচনা চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে সংকট কাটাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত আছে।
অন্যদিকে, শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, নীতিগত সহায়তার অভাব সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। যমুনা এলপিজির পরিচালক ইয়াসির আরাফাত জানান, সরকার এলপিজিকে ‘গ্রিন এনার্জি’ হিসেবে ঘোষণা দিলেও ব্যাংকিং সুবিধা ও আর্থিক সহায়তা বাস্তবে মিলছে না। বেঙ্গল এলপিজির পরিচালক ফিরোজ আলম বলেন, সরবরাহকারীরা অর্ডার নেওয়ার পরও নির্ধারিত সময়ে এলপিজি দিতে পারছে না, ফলে চলতি মাসে তাদের বটলিং কার্যক্রমই বন্ধ ছিল। বিএম এনার্জির মহাব্যবস্থাপক অলক কুমার পন্ডিত জানান, দুবাই থেকে এলপিজি কিনতে অনেক আগেই এলসি করা হলেও সরবরাহকারী এখনো জাহাজে লোডের তারিখ দিচ্ছে না। তবে মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশ থেকে আগেই কেনা এলপিজি দিয়ে তারা আপাতত বটলিং চালু রেখেছেন।
বর্তমানে দেশে মাসিক এলপিজি চাহিদা দেড় লাখ থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টনের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে। অথচ আমদানি নিশ্চিত হয়েছে মাত্র ১ লাখ ২০ হাজার টনের মতো। এই ঘাটতি নিয়ে সরকার উদ্বিগ্ন। সে কারণেই সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তিতে এলপিজি আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফিলিপাইনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে ৮ থেকে ১০ দিনের মধ্যে কয়েক হাজার টন এলপিজি আনার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাংলাদেশ-ফিলিপাইন চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি হুমায়ুন রশীদ জানিয়েছেন, দ্রুত এলপিজি না এলে সংকট কাটবে না। ফিলিপাইনের দ্বীপভিত্তিক জ্বালানি নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে সেখানে এক লাখ টনের বেশি এলপিজি মজুত থাকে, যা কূটনৈতিক উদ্যোগ নিলে স্বল্প সময়েই আনা সম্ভব।
এদিকে, আমদানিকারকরা জানিয়েছেন, জাহাজ সংকটের কারণে পরিবহণ ভাড়া প্রতি টনে ১১০ ডলার থেকে বেড়ে ১৮০ ডলারে পৌঁছেছে। তবুও সেই এলপিজি এখনো দেশে আসেনি। প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে দেশে বিদ্যমান মজুত এলপিজির দাম এত বেশি কেন নেওয়া হচ্ছে। লোটাবের সভাপতি দাবি করেছেন, কোনো বটলিং কোম্পানি বিইআরসির নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নিচ্ছে না। তবে ১ হাজার ৩০৫ টাকার সিলিন্ডার যদি ২ হাজার টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়, তা তদারকি ও নিয়ন্ত্রণ করার দায়িত্ব সরকারের। তার অভিযোগ, বিষয়টি বারবার জানানো হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও তেমন তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। ●
অকা/জ্বা/ই/সকাল/১৯ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 1 week আগে

