অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
দেশের অর্থনীতি যখন বিনিয়োগ স্থবিরতা, দুর্বল ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ধীরগতির রাজস্ব প্রবৃদ্ধির চাপে রয়েছে, ঠিক সেই সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় অঙ্কের বেতন ও ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব নতুন করে আর্থিক উদ্বেগ তৈরি করেছে। জাতীয় পে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশন সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এই সুপারিশ কার্যকর করতে হলে সরকারের বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে, যা বর্তমান রাজস্ব কাঠামোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অর্থনীতি একাধিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি—উভয় ধরনের বিনিয়োগেই গতি কম, অভ্যন্তরীণ বাজারে ভোক্তা চাহিদা দুর্বল এবং রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধিও প্রত্যাশিত হারে বাড়ছে না। এর বিপরীতে দেশি ও বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদের বোঝা দ্রুত বাড়ছে। ফলে সরকারের দৈনন্দিন পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করাই ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে।
এই বাস্তবতার মধ্যেই পে কমিশনের প্রস্তাব অর্থনীতিবিদদের দৃষ্টি কেড়েছে। তাদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক সক্ষমতায় এত বড় অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয় জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব। এমনকি যদি এই বেতন বৃদ্ধি তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হয়, তবুও প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হবে। এই অঙ্কটি দেশের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় সাড়ে তিন মাসের সমান, যা রাজস্ব ব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে।
নির্বাচনি বছর হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো একদিকে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি ব্যয়ের তুলনায় রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি পিছিয়ে রয়েছে। ফলে পে কমিশনের সুপারিশ এবং রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি—দুটোই একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা রাষ্ট্রের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক লিড ইকোনোমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এত বড় ব্যয় মেটানোর জন্য কোনো সুস্পষ্ট ও টেকসই অর্থের উৎস এখনো দৃশ্যমান নয়। তার মতে, এটি শুধু বড় অঙ্কের ব্যয় নয়, বরং একটি স্থায়ী পরিচালন ব্যয়, যা একবার চালু হলে প্রতিবছর বহন করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ঋণ করে এই ব্যয় মেটালে ভবিষ্যতে সুদ ও আসল পরিশোধের চাপ বাড়বে, আর টাকা ছাপিয়ে অর্থ জোগান দিলে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়বে।
ড. জাহিদ হোসেন আরও মনে করেন, গড়ে ১০০ শতাংশের বেশি বেতন বৃদ্ধির অর্থনৈতিক যুক্তি দুর্বল। ২০১৭ সালের পর থেকে মূল্যস্ফীতি ও অন্যান্য সুবিধার হিসাব ধরলেও সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত সমন্বয় যুক্তিযুক্ত হতে পারত। দক্ষ জনবল ধরে রাখার যুক্তি দেখালে বেসরকারি খাতের মজুরি কাঠামোর সঙ্গেও তুলনা করা প্রয়োজন, যেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তেমন উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়নি।
এদিকে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদও বিষয়টিকে “খুবই চ্যালেঞ্জিং” বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, রাজস্ব আদায় কিছুটা বাড়লেও এখনো লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হচ্ছে না। ভবিষ্যতে উন্নয়ন ব্যয়ের চাপ বাড়লে সরকারের ওপর রাজস্ব বাড়ানোর দায় আরও বেড়ে যাবে। তার মতে, অতীতের মতো এবারও পে কমিশনের সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হবে না। বিভিন্ন পর্যালোচনা কমিটির মাধ্যমে প্রস্তাবগুলো কাটছাঁট করে সরকারের আর্থিক সামর্থ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় অঙ্কের বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব একদিকে প্রত্যাশা তৈরি করলেও অন্যদিকে দেশের রাজস্ব সক্ষমতা ও সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করার আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে। অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে এই প্রস্তাবের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে—এটাই এখন মূল প্রশ্ন। ●
অকা/রা/ই/দুপুর/২৪ জানুয়ারী, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 days আগে

