মাহ্রুখ মহিউদ্দীন দেশের একাডেমিক বইয়ের অন্যতম জ্ঞানশীল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ইমেরিটাস প্রকাশক খ্যাত ইউপিএল এর প্রতিষ্ঠাতা মহিউদ্দিন আহমেদের মৃত্যুর পর তিনি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করে আসছেন তিন বছর ধরে। মাহ্রুখ বাংলা এবং ইংরেজি ভাষার একাডেমিক এবং সামাজিক বিজ্ঞানের রেফারেন্স উপাদান থেকে শুরু করে শিশু সাহিত্যের প্রকাশনাগুলোতে কাজ করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক পাশের পর জনস্বাস্থ্য বিষয়ে দেশের বাইরে থেকে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেছেন। এছাড়াও তিনি জেমস পি গ্রান্ট স্কুল অফ পাবলিক হেলথ এবং ব্র্যাক ইউনিভার্সিটিতে একজন ফ্যাকাল্টি এবং গবেষক।
অমর একুশে গ্রন্থ মেলাকে ভিত্তি করে অর্থকাগজ কদিন আগে শীত বিকেলে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে মিলিত হয়। দীর্ঘ কথোপকথনের নির্বাচিত অংশটুকু নিয়ে এ সংখ্যার মূল রচনা তৈরি করা হয়েছে। মহানগরীর গ্রীন রোডস্থ ইউপিএল কার্যালয়ে বসে নেওয়া প্রশ্ন উত্তর পর্বের সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন প্রতিবেদক তারেক আবেদীন
অর্থকাগজ ● দীর্ঘদিন ধরে আপনারা গ্রন্থ প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত। সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশে একজন প্রকাশকের কী দায়িত্ব থাকা উচিত বলে আপনি মনে করেন?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিকাশের একটি অংশ নির্ভর করে প্রকাশকের দায়িত্ব পালনের ওপর। সেটা হলো সাহিত্য ও সংস্কৃতির মানসম্পন্ন অংশটুকুকে মানসম্পন্ন একটি প্রকাশনা আকারে মানুষের সামনে উপস্থাপন করা। শিল্পী-সাহিত্যিক-দার্শনিক-বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে জনগণের সেতুবন্ধনের কাজটি করেন প্রকাশক। ফলে এই দায় পেশাগতভাবেই খানিকটা তাদের ওপর বর্তায়, একজন প্রকাশক কাজটি কতটুকু করতে পারলেন, তার ওপরই তার পেশাগত সার্থকতা নির্ভর করে।
অর্থকাগজ ● দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মৌলিক লেখকদের নিয়ে আপনাদের প্রতিষ্ঠান কী কাজ করছে?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - প্রত্যন্ত বা কেন্দ্র কিংবা আন্তর্জাতিক নির্বিশেষে যাদের লেখাকে উপযুক্ত মনে হয়, তাদের লেখা প্রকাশ করা প্রকাশকের কাজ। স্থান কিংবা অঞ্চলের দুর্গমতার বিচারে কিছু এখানে করার বা ভাবার নেই।
অর্থকাগজ ● সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে প্রকাশক লেখক সম্পর্ক সহজতর হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে লেখক প্রকাশকের পিছনে ছুটছেন! বাণিজ্যিকভাবে লেখক সৃষ্টি হচ্ছে দেশে। সে ক্ষেত্রে মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়! এ ব্যাপারে আপনারা কী করছেন?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - মানহীন বই নিয়ে একটা অযথা উদ্বেগ দেশে দেখা যাচ্ছে! প্রতিটা প্রকাশক নিজের মানদ- অনুযায়ী বই প্রকাশ করেন, করবেন এটাই সঙ্গত। পৃথিবীর সব দেশেই সকল মানের ও মাপের বই নিয়মিত প্রকাশ পায়। দুনিয়ার কোন সমাজেই অধিকাংশ বইয়ের দ্বিতীয় মুদ্রণ হয় না। প্রকাশকরা তাদের পেশা, সম্ভাব্য পাঠকের বাজার ও রুচি অনুযায়ী বই প্রকাশ করেন। কখনো তারা লাভবান হন, কখনো লোকসান হয়। কিন্তু বইয়ের মান ও রুচি নির্ধারণ করা, তা চাপিয়ে দেয়াটা বিপদজনক হতে পারে। ইউপিএল নিজে প্রধানত অ্যাকাডেমিক বই প্রকাশ করে, বেশিরভাগ বইয়ের ক্ষেত্রে যথাযথ পর্যালোচনা প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়। আমাদের এই প্রক্রিয়া অন্যদের সঙ্গে আমরা ভাগাভাগি করতে পারি, কিন্তু অন্যদের বই মানহীন কি না, সেটা নির্ধারণে প্রকাশকদের দায় নেই। বরং, আমাদের দেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার বই কেনার ক্ষেত্রে যে মানহীনতা, প্রায় নকল এবং অনেক সময় (স্বত্বাধিকারীর অনুমোদন ব্যতীত) বেআইনীভাবে প্রকাশিত বইয়ের প্রাধান্য দেখা যায়, সেটা নিয়েই আলাপ করা উচিত।
অর্থকাগজ ● অনেক সময় শুনি লেখকরা টাকার বিনিময়ে বই প্রকাশ করে থাকেন। বই বিপণন প্রক্রিয়া কেমন হওয়া উচিত?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - টাকার বিনিময়ে বই ছাপাটা যে আপনারা শুনতে পান, সেটাই একটা আশ্চর্য বিষয়। সারা পৃথিবীতেই টাকার বিনিময়ে বই ছাপা হয়। কোন ব্যতিক্রম এতে নেই। কিন্তু কোথাও এটা আলোচনার বিষয় না, কিংবা এতে কোন রহস্য, গোপনীয়তা, অপরাধ বা উদঘাটন নেই। বাংলাদেশেই এটা সম্ভব হয়েছে, কারণ প্রশ্নকর্তারা আসলেই প্রকাশনা বিষয়ে যথেষ্ট অবগত না হয়ে শুধু তাদের নিজের কা-জ্ঞান দিয়েই প্রশ্ন করেন। বই বিপনন একটা সময়ে বই বিক্রেতাদের একটা বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে হতো। সামনের দিনে তা হয়তো আরও বেশি করে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে হবে। প্রকাশক ও লেখকরা এতে আরও সরাসরি পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। এটা সম্ভবত ইতিবাচক।
অর্থকাগজ ● লেখালিখিকে কী দেশে পেশা হিসেবে নেয়ার সময় হয়েছে? লেখকের সম্মানী এবং রয়েলিটির বিষয়টি অধিকাংশ প্রকাশক ভাবেন না। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - লেখালিখিকে দেশে এখনো পেশা হিসেবে নেয়া কঠিন। অল্প কয়েকজন জনপ্রিয় লেখকের পক্ষে তা সম্ভব। অ্যাকাডেমিক বইয়ের বেলাতে এটা আরও কঠিন। এটা বুঝতে হলে প্রকাশনা ব্যবসার সার্বিক পরিমাপটা হিসাব করে দেখতে হবে। একেকটা গবেষণামূলক বই বছরে ন্যূনপক্ষে ৫০০০ কপি বিক্রি হলে লেখক বই লেখার জন্য গবেষণা করেই টিকে থাকতে পারবেন। এখন গবেষণামূলক বই প্রধানত লেখা হয় গবেষণার উপজাত হিসেবে। কাজেই লেখালেখিকে একজন অ্যাকাডেমিক মুখ্য পেশা হিসেবে গ্রহণ করে টিকে থাকতে পারবেন না, এই দেশে তো নয়ই, উন্নততম দেশেও তা সম্ভব নয়।
অর্থকাগজ ● অধিকাংশ প্রকাশক বলেন বইয়ের ব্যবসায় নেই, অথচ প্রতি বছর বই মেলায় ৫ থেকে ৬ হাজার বই প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে কী বলেন?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - বইমেলায় মাত্র ৫ থেকে ৬ হাজার বই বিক্রি হয়, এটা অত্যন্ত কম একটি সংখ্যা। কারণ সারা বছর এর চাইতে অনেক কম বই আসে। মাথাপিছু জনগোষ্ঠী, কিংবা শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হিসেবে এটা অত্যন্ত কম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২২ সালে ৪৪২৪০ জন লেখক ছিলেন। গত বছর দেশটিতে অন্তত ১০ হাজার বই প্রকাশ করেছে প্রধান প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো। এর বাইরে বিপুল পরিমাণ বই দেশটিতে প্রকাশিত হয়েছে। মানুষ নিজেকে বই দিয়ে প্রকাশ করে, এতে আমরা কোন সমস্যা দেখি না। এর মাঝে কোন সহিংসতা নেই, আক্রমণ নেই, বরং একটা চেষ্টা আছে। এটাকে উৎসাহিত করা দরকার। বইয়ের ব্যবসা থাকা না থাকার সঙ্গেও এর সম্পর্ক নেই। বইয়ের যেহেতু বাজার কম, এই বইয়ের অধিকাংশ শৌখিন একজন লেখক নিজের অর্থে প্রকাশ করেন, বিপনন করেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে একটা দুটো বইয়ের পর ভুলেও যান। কিন্তু নিজেকে প্রকাশ করতে বইয়ের আশ্রয় নেয়া একটা আকর্ষণীয় পদ্ধতি।
অর্থকাগজ ● অমর একুশে বই মেলা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপনার বক্তব্য? বাংলা একাডেমির কী করা উচিত? বাংলা একাডেমির এবারের ব্যবস্থাপনা নিয়ে আপনি কতটা সন্তুষ্ট?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - বইমেলা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত বলার সুযোগ নেই। এর কোন কোন দিক ভালো, কোন কোন দিক মন্দ। আমরা আনন্দিত যে পরিস্থিতি আগের চাইতে খারাপ নয়। আরও ভালো হলে নিশ্চয়ই আমরা আরও আনন্দিত হতাম!
অর্থকাগজ ● অধিকাংশ প্রকাশক সরকারের আনুকূল্য লাভের আশায় প্রকাশনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও সমসাময়িক বিষয়কে প্রাধান্য দেন! এতে প্রকাশনা শিল্পের কী ক্ষতি হচ্ছে?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - আমরা মূলত অ্যাকাডেমিক বই প্রকাশ করি বলে অন্য প্রকাশকদের আগ্রহ নিয়ে আমরা প্রধানত ততটা ভাবি না। দীর্ঘমেয়াদে ভালো করাই আমাদের লক্ষ্য। তবে প্রকাশকরা যদি আনুকূল্য পাবার আশায় বই প্রকাশ করেন, সেটার দায় আনুকূল্য যারা দেন, তাদের ওপর প্রধানত বর্তায়। কাজেই বই কেনার খাতটি যেন দুর্নীতি মুক্ত হয়, সেটা নিয়ে যেন প্রতিবেদন হয়, সেটা করাই সংশ্লিষ্টদের কর্তব্য। প্রকাশনা একটা পেশা। পেশার সংস্কৃতি যদি প্রকাশকদের চাইতে যারা ক্ষমতাবান, তারা দূষিত করতে থাকেন, প্রকাশকদের একটা বড় অংশও তার শিকারে পরিণত হবে। দায়টা তাদের যারা সিদ্ধান্ত নেন এবং তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করেন।
অর্থকাগজ ● গ্রন্থের সম্পাদনার মান নিয়ে অনেকেই হতাশা ব্যক্ত করেন! এটা কেন?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - ভালো সম্পাদনা যারা পারেন, তারা যে কোন পেশাতেই ভালো করবেন। যতক্ষণ না বেশি দামে যে বই কেনা উচিত, সেই বিষয়ে সাংবাদিকরা জনমত তৈরি করতে সক্ষম হবেন, ততক্ষণ সম্পাদনার মান খারাপ থাকবে। কারণ সম্পাদনা মানে শুধু বানান দেখা নয়। ইউপিএল যে সকল বই যথাযথ সম্পাদনা করে প্রকাশ করে, সেগুলোর দাম বাংলাদেশের বাজারের হিসেবে অনেক বেশি হয়। গভীর জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রকাশনায় ধরে রাখতে হলে বই বিক্রি ও বইয়ের দাম উভয়টিই বাড়াতে হবে। সরকারী ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্রয় ছাড়া এটা সম্ভব না। একই সঙ্গে আমার মনে হয় হতাশ না হবার মত অনেক সুসম্পাদিত বই বাজারে আছে।
অর্থকাগজ ● প্রকাশনা শিল্পের উন্নয়নে লেখক ও পাঠকের কী ধরনের দায়িত্ব ও ভূমিকা থাকা দরকার?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - লেখকের কাজ ভালো বই তৈরি করা, পাঠকের কাজ লেখক ও প্রকাশকের পৃষ্ঠপোষকতা করা। এর বাইরে তাদের বাড়তি দায়িত্ব হতে পারে সরকার ও দায়িত্বশীলদের ওপর চাপ তৈরি করা।
অর্থকাগজ ● দেশের রাজনীতিবিদগণ শিক্ষাবিদদের পাশ কাটিয়ে নিজস্ব ভাবধারার শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন দীর্ঘদিন যাবৎ করে আসছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন? এ ব্যাপারে সরকারের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?
মাহ্রুখ মহিউদ্দীন - প্রশ্নটির উত্তর রাজনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের কাছে রয়েছে। আমি এতটুকুই বলতে পারি যে প্রকাশক আপামর সমাজের বাইরের কেউ নয়। আমরা কাদের জন্য কেমন শিক্ষা ব্যবস্থা চাই, এই শিক্ষা ব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী প্রভাবকে কেমনভাবে দেখি, এই বিষয়ে রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ, সরকার ও জনগণের মধ্যে ভাবনার আদান প্রদানের মাধ্যমে একটা স্পষ্ট অবস্থানে আসা প্রয়োজন। প্রকাশকের ভূমিকা এখানে নেই।
অকা/সা/সকাল/১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 years আগে

