অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) রাজস্ব আদায়ে যে প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। এনবিআরের সাময়িক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই–অক্টোবর সময়ে মোট সংগ্রহ হয়েছে ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৭৮ কোটি টাকা, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫.৫ শতাংশ বেশি।
গত অর্থবছরের প্রথম চার মাস ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক অচলাবস্থা ও সহিংসতায় পূর্ণ। অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বাণিজ্য, পরিবহন, উৎপাদন—সবকিছুই ছিল সীমিত পরিসরে। ফলে ২০২৪–২৫ অর্থবছরের ওই সময় রাজস্ব সংগ্রহ থেমে ছিল ১ লাখ ৩ হাজার ৪০৯ কোটি টাকায়। তুলনামূলকভাবে অর্থনীতি এ বছর কিছুটা স্বাভাবিক ছন্দে ফেরায় রাজস্ব আদায় বেড়েছে।
লক্ষ্যমাত্রা এখনো দূরে
অর্থনীতির গতি কিছুটা ফিরলেও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এখনও ধরা যাচ্ছে না। চলতি সময়ে আদায়ের লক্ষ্য ছিল ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৭.৭ কোটি টাকা। বাস্তবে তা অর্জিত হয়নি, ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।
এটি ইঙ্গিত করে যে, স্বল্পমেয়াদি প্রবৃদ্ধির বাইরে এনবিআর এখনো কাঠামোগত দুর্বলতায় আটকে আছে—কর নেট সম্প্রসারণ ধীর, ভ্যাট বাস্তবায়ন পুরোপুরি ডিজিটাল হয়নি, আর বড় করদাতাদের ওপর নির্ভরতা এখনো অত্যধিক।
ভ্যাট খাতে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে সবচেয়ে শক্তিশালী অগ্রগতি দেখা যায় স্থানীয় ভ্যাটে। এ খাত থেকে আদায় হয়েছে ৪৬ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা, প্রবৃদ্ধি ২৪.৭৮ শতাংশ।
এই উন্নতির পেছনে তিনটি কারণ কাজ করেছে—
১) বড় খুচরা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ডিজিটাল ভ্যাট সিস্টেমে আনা,
২) বাজার স্বাভাবিক হওয়ায় খুচরা পর্যায়ের বিক্রি বৃদ্ধি,
৩) অনলাইন ব্যবসা ও পরিষেবা খাতে কর-নজরদারি বাড়ানো।
আয়কর খাতে মাঝারি গতি
আয়কর ও ভ্রমণ কর খাতে আদায় হয়েছে ৩৭ হাজার ৮৪৯ কোটি টাকা, যা ১৬.১১ শতাংশ বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, চাকরিক্ষেত্রে পুনরুদ্ধার এবং কর নেট সম্প্রসারণ এখানে ভূমিকা রেখেছে। তবে ব্যক্তিখাতে অনেকে এখনো কর কাঠামোকে জটিল ও অনুৎসাহমূলক মনে করেন—যা এনবিআরের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির পথে ঝুঁকি।
আমদানি–রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধি সীমিত
আমদানি–রফতানি খাত থেকে আদায় হয়েছে ৩৪ হাজার ৭৫১ কোটি টাকা, মাত্র ৪.৫৩ শতাংশ বেশি।
কারণ হিসেবে দেখা যায়—
-
ডলার সংকটে আমদানি এখনো আগের স্বাভাবিক পর্যায়ে যায়নি,
-
নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি অনেক পণ্যে শুল্ক আদায় কমিয়ে দিয়েছে,
-
আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বাণিজ্যক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে।
সামগ্রিক চিত্র: প্রবৃদ্ধি আছে, কাঠামোগত সমস্যা অম্লান
২০২৪–২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যার প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ২.২৩ শতাংশ—অত্যন্ত কম। ফলে বড় প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে এনবিআরকে স্বয়ংক্রিয়ীকরণ, ভ্যাট বাস্তবায়ন, এবং কর ফাঁকি রোধে শক্তিশালী চক্র ভাঙার প্রয়োজন হবে।
চলতি অর্থবছরে বাজেটের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা—জিডিপির ৯ শতাংশ। এর মধ্যে এনবিআরের লক্ষ্য ৪ লাখ ৯৯ হাজার কোটি টাকা, আর বাকি ৬৫ হাজার কোটি টাকা আসবে অ-এনবিআর উৎস থেকে।
এত বড় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে হলে চলমান প্রবৃদ্ধিকে শুধু ধরে রাখা নয়—বরং কর নেট বাড়ানো, কর আদায়ে প্রযুক্তিগত সংহতি এবং বড় করদাতাদের ওপর নির্ভরতা কমানো জরুরি।
রাজস্ব আদায়ের এই উত্থান অর্থনীতির আংশিক পুনরুদ্ধারের ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু কাঠামোগত উন্নতি ছাড়া এই প্রবৃদ্ধি টেকসই হবে না। বাজেট লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য এনবিআরকে এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন—এই তিন ক্ষেত্রেই আক্রমণাত্মক পদক্ষেপ নিতে হবে। ●
অকা/রা/ই/দুপুর/২২ নভেম্বর, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 2 months আগে

