বিশেষ প্রতিনিধি> 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান অবসরে যাওয়ার ঠিক আগে কর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজের আস্থাভাজন কর্মকর্তাদের বসানোর উদ্যোগ নিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকা ছয়টি কর কমিশনারের পদ পূরণের ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডার থেকে প্রত্যাবর্তন করা কয়েকজন কর্মকর্তাকে দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে কমিশনার পদে বসানোর প্রক্রিয়া নিয়ে এনবিআরের ভেতরে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, কর প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো দীর্ঘদিন ইচ্ছাকৃতভাবে শূন্য রাখা হয়েছিল। এখন চেয়ারম্যানের অবসরের প্রাক্কালে প্রশাসন ক্যাডার থেকে ফিরে আসা চার কর্মকর্তাকে অতিরিক্ত কর কমিশনার পদে উন্নীত করে কমিশনারের চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতেও এনবিআরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজের প্রভাব ও কর্তৃত্ব ধরে রাখার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ কর কমিশনারেটে কমিশনার পদ শূন্য রয়েছে। এগুলো হলো— কেন্দ্রীয় কর জরিপ অঞ্চল, কর অঞ্চল রাজশাহী, কর আপিল অঞ্চল রাজশাহী, কর অঞ্চল রংপুর, কর অঞ্চল-৫, চট্টগ্রাম, কর অঞ্চল-৮, ঢাকা। এসব কমিশনারেটে বর্তমানে অন্য কর অঞ্চলের কমিশনাররা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে কর আপিল অঞ্চল, রাজশাহীর দায়িত্ব পালন করছেন খুলনা কর অঞ্চলের কমিশনার এবং কর অঞ্চল-৫, চট্টগ্রামের দায়িত্ব পালন করছেন কর অঞ্চল-৪, চট্টগ্রামের কমিশনার।

রাজস্ব প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন, বাজেট-পরবর্তী ও রাজস্ব আহরণের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এতগুলো কমিশনারেট দীর্ঘদিন কমিশনারশূন্য থাকা অস্বাভাবিক। এতে কর আদায় কার্যক্রমের পাশাপাশি প্রশাসনিক কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তাদের অভিযোগ, এই শূন্য পদগুলো পরিকল্পিতভাবে পূরণ করা হয়নি, যাতে পরবর্তীতে নির্দিষ্ট কর্মকর্তাদের সেখানে বসানো যায়।

এনবিআরের অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, বিসিএস ২০তম ব্যাচের চার কর্মকর্তা একসময় কর ক্যাডার ছেড়ে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় প্রশাসনে কর্মরত থাকার পর তারা পুনরায় এনবিআরে প্রত্যাবর্তন করেন। এই চার কর্মকর্তা হলেন— ড. মো. নুরুল আমিন, দীপক কুমার চক্রবর্তী, মো. মাহবুবুল মোর্শেদ, ড. নাশিদ রিজওয়ানা মনির, অভিযোগ রয়েছে, প্রত্যাবর্তনের পর অল্প সময়ের মধ্যেই তাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়।

গত ২ মার্চ ড. নাশিদ রিজওয়ানা মনিরকে কর অঞ্চল-৬, ঢাকায় চলতি দায়িত্বে অতিরিক্ত কর কমিশনার করা হয়। পরে গত ৭ মে ড. মো. নুরুল আমিনকে কর অঞ্চল-২, ঢাকা, দীপক কুমার চক্রবর্তীকে কর আপিল অঞ্চল, চট্টগ্রাম এবং মাহবুবুল মোর্শেদকে কর অঞ্চল-৪, চট্টগ্রামে চলতি দায়িত্বে অতিরিক্ত কর কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

এখন তাদেরকে স্থায়ীভাবে অতিরিক্ত কর কমিশনার পদে পদোন্নতি দিয়ে শূন্য কমিশনারেটগুলোতে কমিশনার হিসেবে পদায়নের প্রস্তুতি চলছে বলে এনবিআরের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা রয়েছে।

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, বিসিএস ২৪ ব্যাচসহ কর ক্যাডারের অনেক কর্মকর্তা পদোন্নতির জন্য দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষা করছেন। কিন্তু তাদের পদোন্নতির বিষয়টি উপেক্ষা করে প্রত্যাবর্তিত কর্মকর্তাদের দ্রুত উপরের পদে বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তাদের দাবি, কর প্রশাসনের ভেতরে কর্মরত কর্মকর্তাদের বদলে বাইরের ক্যাডার থেকে প্রত্যাবর্তিতদের অগ্রাধিকার দেওয়া হলে দীর্ঘদিন ধরে এনবিআরে কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি হবে।

একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রথমে গুরুত্বপূর্ণ কমিশনারেটগুলো দীর্ঘদিন শূন্য রাখা হয়েছে। পরে সেখানে নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তাকে বসানোর জন্য কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া বলেই মনে হচ্ছে।

এনবিআরের ভেতরে আলোচনা রয়েছে, চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান বিশেষভাবে ড. মো. নুরুল আমিনকে কমিশনার পদে পদায়নের বিষয়ে আগ্রহী। কারণ তার বাড়ি চেয়ারম্যানের নিজের এলাকা লক্ষ্মীপুর জেলায়। এ কারণে পদোন্নতি প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, তবে কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক গুঞ্জন বিরাজ করছে।

এনবিআরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, যুগ্ম কর কমিশনার থেকে অতিরিক্ত কর কমিশনার পদে পদোন্নতির জন্য নির্ধারিত চাকরিকাল ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করার বিধান রয়েছে।

কিন্তু প্রত্যাবর্তিত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদেরকে অতিরিক্ত কর কমিশনার পদে উন্নীত করে পরে কমিশনারের চলতি দায়িত্ব দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ রয়েছে, এ প্রক্রিয়ার পেছনে চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ একটি প্রভাবশালী মহল সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।

জানা গেছে, ড. নাশিদ রিজওয়ানা মনির গত ১ মার্চ জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এনবিআরে যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন। যোগদানপত্রে তিনি উল্লেখ করেন যে, ‘সরকারের উপসচিব, যুগ্মসচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিব পদে পদোন্নতি বিধিমালা, ২০০২’-এর ৭(৪) বিধি অনুসরণ করে তাকে এনবিআরে ন্যস্ত করা হয়েছে।

অন্য তিন কর্মকর্তাও প্রায় একই সময়ে যুগ্ম কর কমিশনার হিসেবে এনবিআরে যোগদান করেন।

তবে এনবিআরের একাংশের কর্মকর্তারা প্রশ্ন তুলছেন, প্রত্যাবর্তনের পরপরই দ্রুত পদোন্নতির উদ্যোগ কতটা যৌক্তিক এবং তা বিদ্যমান বিধি ও প্রচলিত প্রশাসনিক রীতিনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

এনবিআরের কিছু কর্মকর্তা দাবি করেছেন, ড. মো. নুরুল আমিন এবং দীপক কুমার চক্রবর্তী অতীতে তৎকালীন এনবিআর চেয়ারম্যান নজিবুর রহমানের সময়ে প্রভাবশালী একটি প্রশাসনিক বলয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সে সময় কর প্রশাসনে ভয়ভীতি ও অনিয়মের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় তারা ভূমিকা রেখেছিলেন বলেও অভিযোগ করা হচ্ছে।

তবে এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন অতিরিক্ত কর কমিশনার ড. মো. নুরুল আমিন। তিনি বলেন, সিআইসি'র প্রধান পদে যাওয়ার কোনো চেষ্টা তিনি করছেন না। তৎকালীন চেয়ারম্যান বা অন্য কোনো কর্মকর্তার সহযোগী হিসেবে কাজ করার অভিযোগও সত্য নয়।

তিনি আরও বলেন, “আমরা প্রশাসন ক্যাডার থেকে আসিনি। আমরা মূলত ট্যাক্স ক্যাডারের কর্মকর্তা। বিধি অনুযায়ী প্রত্যাবর্তন করেছি। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।”

এনবিআরের একাধিক কর্মকর্তা মনে করেন, প্রতিষ্ঠানটিকে বিভক্ত করার সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়িত না হওয়ায় চেয়ারম্যান অসন্তুষ্ট। সেই কারণেই তিনি বিদায়ের আগে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে নিজের আস্থাভাজনদের বসিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন।

তাদের অভিযোগ, এর ফলে ভবিষ্যতে যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

নির্ধারিত বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের আগামী ২৯ জুন অবসরে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তিনি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বা দায়িত্ব পুনর্মূল্যায়নের সম্ভাবনা বাড়াতে লবিং জোরদার করেছেন।

এদিকে অবসরের আগে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজের পছন্দের কর্মকর্তাদের বসানোর অভিযোগ নিয়ে এনবিআরের ভেতরে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

Leave A Reply

Exit mobile version