অর্থকাগজ প্রতিবেদন>

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবসায়নের তালিকায় থাকা ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত সপ্তাহে দরবৃদ্ধির শীর্ষে উঠে এসেছে। আর্থিক জালিয়াতি, চরম তারল্যসংকট ও বছরের পর বছর লভ্যাংশ না দেওয়ায় ‘জেড’ বা দুর্বল গ্রুপে থাকা কোম্পানিটির শেয়ারের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিস্মিত করেছে। একই সঙ্গে বাজারে জেড গ্রুপের শেয়ারের দর বাড়ানোর পেছনে কারসাজি চক্র সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

ফারইস্ট ফাইন্যান্সের পাশাপাশি ডিএসইতে মৌলিক ভিত্তিসম্পন্ন ভালো কোম্পানির বদলে দাপট দেখিয়েছে ‘জেড’ গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো। কোনো ধরনের ব্যবসায়িক কার্যক্রম না থাকা, বছরের পর বছর লভ্যাংশ না দেওয়া এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের সিদ্ধান্ত হওয়ার পরও এসব বন্ধ ও দুর্বল কোম্পানির শেয়ারের অস্বাভাবিক দরবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন সাধারণ বিনিয়োগকারী ও বাজার বিশ্লেষকেরা।

বিদায়ী সপ্তাহে ডিএসইতে দরবৃদ্ধির শীর্ষ ১০ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাতটিই ছিল জেড গ্রুপের। এমনকি শীর্ষ সাতটি অবস্থানও দখল করেছে এই গ্রুপের কোম্পানিগুলো।

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দিলে কোনো কোম্পানি ‘এ’ গ্রুপে, ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দিলে ‘বি’ গ্রুপে এবং টানা লভ্যাংশ দিতে ব্যর্থ হলে ‘জেড’ গ্রুপে স্থান পায়। লভ্যাংশ দিতে না পারার কারণেই মূলত বিনিয়োগকারীদের কাছে এসব কোম্পানি ‘পচা শেয়ার’ হিসেবে পরিচিত।

গত সপ্তাহে ডিএসইতে সবচেয়ে বেশি দর বেড়েছে ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টের। কোনো যৌক্তিক বা ইতিবাচক আর্থিক তথ্য ছাড়াই সপ্তাহজুড়ে কোম্পানিটির শেয়ারের প্রতি বিনিয়োগকারীদের একাংশের আগ্রহ দেখা গেছে। এতে এক সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ারদর সাড়ে ৩১ শতাংশের বেশি বেড়ে আড়াই টাকায় দাঁড়িয়েছে।

কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, সর্বশেষ ২০১৬ সালে লভ্যাংশ দিয়েছিল ফারইস্ট ফাইন্যান্স। চলতি বছরের সর্বশেষ নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। ২০১৩ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১৬৪ কোটি টাকা। এর প্রায় অর্ধেক শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে।

দরবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় ফারইস্ট ফাইন্যান্সের পরেই ছিল তুং হাই নিটিং। গত সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ারদর বেড়েছে ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ২০১৬ সালের পর থেকে কোম্পানিটি কোনো লভ্যাংশ দেয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এর কারখানার উৎপাদন কার্যক্রমও বন্ধ। একইভাবে ২৭ শতাংশের বেশি দর বেড়ে তালিকায় পরের অবস্থানে ছিল লভ্যাংশহীন জিবিবি পাওয়ার।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, বাংলাদেশ ব্যাংক ও আদালতের মাধ্যমে যেসব আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়নের প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং প্রায় দেউলিয়া, সেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারও হঠাৎ করে দরবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় উঠে এসেছে। গত সপ্তাহে ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, এফএএস ফাইন্যান্স, ফার্স্ট ফাইন্যান্স ও পিপলস লিজিংয়ের শেয়ারদর ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর এবং আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে ব্যর্থ এসব কোম্পানির ব্যবসায়িক কার্যক্রম স্থবির থাকার পরও শেয়ারের দরে হঠাৎ এমন লাফকে কৃত্রিম কারসাজি হিসেবে দেখছেন বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দরবৃদ্ধির শীর্ষ তালিকায় থাকা জিএসপি ফাইন্যান্সও জেড গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে প্রাইম ইন্স্যুরেন্স ও আইসিবি সোনালী ওয়ান মিউচুয়াল ফান্ড ছিল ভালো গ্রুপের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান।

শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মূলধনী মুনাফার আশায় যখন ভালো কোম্পানিকে পেছনে ফেলে বন্ধ বা অবসায়িত প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দর বাড়তে থাকে, তখন এর পেছনে নির্দিষ্ট কোনো চক্র সক্রিয় থাকার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। কম দামি ও দুর্বল শেয়ারের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা অর্থ বিনিয়োগ করলে পরবর্তী সময়ে বড় ধরনের মূলধন হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

সর্বশেষ হালনাগাদ 12 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version