রেজাউল করিম খোকন ●
সামনে ঈদ। সাধারণত আমাদের দেশে বিভিন্ন ধর্মীয়, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং উৎসবকে কেন্দ্র করে (যেমন, ঈদ, দুর্গাপূজা, বাংলা নববর্ষ) পোশাক- আশাক, খাবার দাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সামগ্রীর বাজার বেশ জমজমাট হয়ে উঠে। উৎসবকে কেন্দ্র করে চাকরিজীবিরা বিশেষ বোনাস-ভাতা পান। ফলে নিজের এবং পরিবার-পরিজনদের জন্য উৎসবকেন্দ্রিক বিশেষ কেনাকাটার ধুম পড়ে যায়। যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সাধ্যমত কেনাকাটার জন্য দোকান, মার্কেট, বুটিকস শপ, ফ্যাশন হাউজ, শপিংমলগুলোতে ভিড় জমান। এটা অতীত সময় থেকে চলে আসছে। এই উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটার ব্যাপারটি যেন ঐতিহ্যের, সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। দিনে দিনে আর্থিক সক্ষমতা, ক্রয়সামর্থ্য বেড়ে যাওয়ায় উৎসবকে কেন্দ্র করে বাজারের সম্প্রসারণ ঘটেছে। তবে করোনা মহামারীর ভয়াবহ সময় পার করার কারণে গত দুই বছর মানুষ ঈদ কিংবা বাংলা নববর্ষ, দুর্গাপূজা উৎসবে বাজারে গিয়ে নতুন জামা কাপড়, সাজ পোশাক কেনাকাটা করতে পারেনি। যার ফলে বিগত দুই বছর উৎসবকেন্দ্রিক বাজার মোটেও জমেনি। লকডাউনের কঠোর বিধিনিষেধ এর কারণে মার্কেট, শপিং মলের দোকানদার, ব্যবসায়ী তাদের পসরা সাজাতে পারেননি। দোকান খুললেও ক্রেতার অভাবে বিক্রি বাটটা মোটেও হয়নি। নতুন পোশাক কিংবা অন্যান্য সামগ্রী অবিক্রিত রয়ে গেছে। গত দুই বছরে এ ভাবে চরম লোকসান আর গচ্চা দিতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ী সর্বশান্ত হয়েছেন। তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম দেখে সবাই সহানুভূতি জানিয়েছেন, বিশেষ আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করার দাবি তুলেছেন। কিন্তু বাস্তবে সেই ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা এখনও সম্ভব হয়নি তাদের। তবে এ বছর বাংলা নববর্ষ, মাহে রমজান এবং ঈদ উৎসব খুব কাছাকাছি সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এদিকে করোনা মহামারী পরিস্থিতির বেশ উন্নতি হয়েছে। সবার মাঝে বিরাজমান সেই আতঙ্ক, ভয়ভাব কেটে গিয়ে স্বস্তি ফিরে এসেছে। যে কারণে এবছর আগের সেই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে উৎসবকেন্দ্রিক বাজার। দোকানে দোকানে, সুপারমার্কেটে, শপিংমলগুলোতে, ফ্যাশন হাউসগুলোতে নতুন নতুন পোশাক, শাড়ি, গয়নার সমারোহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর মধ্যেই ক্রেতার ভিড়ও বেড়েছে। গত দুই বছর মানুষ ঈদ উৎসবে বাজারে গিয়ে মন খুলে নতুন জামা-কাপড় কিনতে পারেনি। করোনার আতঙ্ক চেপে বসেছিল মনে। ঈদকে সামনে রেখে সাধারণত নতুন নতুন পোশাক নিয়ে আসে বাংলাদেশের ফ্যাশন হাউজগুলো। সারা বছরে বিভিন্ন উৎসবকে ঘিরে ব্যবসা চললেও এই সময়টাকে লক্ষ্য করেই চলে তাদের মূল আয়োজন। ভারতীয় ও পাকিস্তানি পোশাকের আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করে বাংলাদেশের ফ্যাশন হাউজগুলো গত কয়েক দশক সময়ে বেশ অনেকটা এগিয়ে গেছে। বড় বড় উৎসবকে সামনে রেখে ফ্যাশন হাউজগুলো দেশীয় কাপড়ে তৈরি দেশের ডিজাইনারদের তৈরি নতুন নতুন ধরনের নকশার পোশাক নিয়ে আসে সাধারণত। যার মধ্যে স্বকীয়তা থাকে। বাজারের বিকাশের মধ্য দিয়ে একসময়ের ঘরোয়া বা সৌখিন বুটিক হাউসগুলো বর্তমানে রূপ নিয়েছে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডে। বৈচিত্র্যময় ডিজাইন, নান্দনিকতা আর দেশীয় ভাবধারার এই পোশাকের দিকে সব বয়সী মানুষই ঝুঁকছেন। তাই চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশীয় পোশাকের বাজার দিনে দিনে বিকশিত হয়েছে । স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে আধুনিক চিন্তা-ভাবনা, ধ্যান-ধারণা নিয়ে বেশ কিছু উদ্যোক্তার সাহসী প্রচেষ্টা দেশীয় পোশাকে এক ধরনের বিপ্লব ঘটায়। দেশীয় কাপড়, দেশীয় বুননে, রঙ ও নকশার বৈচিত্র্যে এসব পোশাক উৎসব-পার্বনে ক্রমেই সবার বিশেষ পছন্দের হয়ে উঠে। কারণ, দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতিকে ধারণ করে সেসব পোশাকে তুলে ধরা হয় নানাভাবে। কিছু উদ্যমী এবং স্বাপ্নিক তরুণ দেশে তৈরি কাপড় নিয়ে ফ্যাশনেবল পোশাক বানানোর যে প্রবণতা শুরু করেছিলেন সেটা আজ নগরজীবনের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ হয়ে উঠেছে। পাশ্চাত্য ফ্যাশনের প্রতি অনুরক্তদের বড় একটি অংশই বর্তমানে দেশীয় কাপড়ে তৈরি পোশাক পরতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ফ্যাশন হাউজগুলো ফ্যাশনের লক্ষ্যণীয় পরিবর্তনের প্ল্যাটফর্ম তৈরির লক্ষ্যে নিরন্তর কাজ করে দেশীয় ফ্যাশনের প্রতি ক্রেতাদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। সেই পথ বেয়ে ফ্যাশন জগতে একটা শৈল্পিক বিপ্লবের ক্ষেত্রে সৃষ্টি হয়েছে। গত কয়েক দশকে আমাদের এখানে এক ধরনের সচেতনবোধ সৃষ্টি হয়েছে। বিদেশি পোশাক মানে ভালোÑ এ ধারণা থেকে বেরিয়ে এসেছেন ক্রেতারা। দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো হাঁটি হাঁটি পা করে আজ যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে তা নিঃসন্দেহে গর্ব করার মতো। তাদের পুরো কর্মকা-ই এখন একটি বিকাশমান শিল্প। তেমন পরিস্থিতিতে বৈশ্বিক মহামারী করোনার ধাক্কা দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলোকে রীতিমতো চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। সম্পূর্ণ দেশীয় ফ্যাক্টরি এবং তাঁতে তৈরি কাপড় এর উপর নির্ভরশীল আমাদের ফ্যাশন হাউজগুলো বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ায় জোগানদার তাঁতি, ছোট ছোট কাপড়ের মিলগুলো তাদের উৎপাদিত কাপড়, শাড়ি এবং অন্যান্য বস্ত্র সামগ্রী বাজারজাত করতে পারেননি। ঈদকে কেন্দ্র করেই ফ্যাশন খাতের সারাবছরের আয়-ব্যয়ের একটি বড় অংশ নির্ধারণ হয়ে থাকে। লকডাউনে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছিলেন স্থানীয় বাজারের পণ্য উৎপাদকরা। যাঁরা পণ্য বিক্রি করেন তাঁদের দোকানপাট বন্ধ ছিল। তাই কারখানায় উৎপাদন করলেও তা বাজারে পৌঁছানো যায়নি, বিক্রিও হয়নি। স্থানীয় বাজারে প্রায় শতভাগ কাপড়ের চাহিদা মেটায় দেশের বস্ত্রকলগুলো। সারাদেশে এখন ছোট-বড় তিন হাজার বস্ত্রকল আছে। এই খাতে কাজ করেন কয়েক লাখ শ্রমিক। সরকার ঘোষিত বিধিনিষেধে দেশী বস্ত্রকলগুলো ভোগান্তিতে পড়েছিল। ঈদের আগে এই সময়েই কাপড়ের সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকে। শুধু নরসিংদীসহ সারাদেশের বস্ত্রকলগুলো থেকে কাপড় প্রথমে নরসিংদীর বাবুরহাট, নারায়ণগঞ্জের গাউসিয়া, সিরাজগঞ্জসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজারে যায়। সেখান থেকে সারাদেশে খুচরা পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের হাতে পৌঁছায়। দেশের কাপড়ের চাহিদার প্রায় পুরোটাই সরবরাহ করে এসব কারখানা। ঈদের আগের এই সময়ে পাইকারি বাজারগুলো জমজমাট থাকে। কারখানাগুলো দিনরাত চলে। একই অবস্থা দেশীয় ফ্যাশন শিল্পের। পর পর দুই বছর মহামারীর ধাক্কা সামলাতে গিয়ে অনেকটা ছোট হয়ে এসেছে দেশীয় ফ্যাশন শিল্পের পরিসর। গত ২ বছরে ফ্যাশন হাউজের অনেক ছোট আউটলেট বন্ধ হয়েছে, অনেক উদ্যোক্তা পেশা পরিবর্তন করেছেন, কারিগর, কর্মচারীদেরকেও ছাড়তে হয়েছে চাকরি। গত বছরও পহেলা বৈশাখের বাজার যখন নতুন নতুন ডিজাইনের শাড়ি, পাঞ্জাবি, থ্রি-পিস ও কুর্তা দিয়ে সাজানো হয়েছিল, তখনই আসে ‘লকডাউন’। সে সময় লোকসান ও ঋণের বোঝা হালকা করতে ফ্যাশন হাউজগুলোতে চলে কর্মী ছাঁটাই। মহামারীর কারণে ফ্যাশন শিল্পটাই মনে হয় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। এখন অফিস ছোট করে, বেশি লোকসানে থাকা আউটলেটগুলো বন্ধ করে দিয়ে কোন রকমে টিকে থাকার চেষ্টায় আছেন । গত ২ বছর সেই বৈশাখ আর ঈদ মৌসুমকে সামনে রেখে দেশে লকডাউন এসেছিল। সবকিছু থেমে গিয়েছিল, কোটি কোটি টাকার পণ্য পড়েছিল বিক্রির আশায়। করোনার ছোবলে পরপর দুই বার লকডাউনে ছারখার হয়ে গেছে দেশীয় ফ্যাশন শিল্প উদ্যোক্তাদের সব স্বপ্ন। ফলে লোকসানের বোঝা বহন করতে না পেরে অনেকে এখন ব্যবসা গুটিয়ে এনেছেন। বন্ধ হয়েছে একাধিক আউটলেট।
এ বছর সেটা না থাকার কারণে সবাই পরিবার পরিজনদের জন্য উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটায় মেতে উঠেছেন। বাজারে চাহিদা সৃষ্টি হওয়ায় সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারি, পণ্য সামগ্রী সরবরাহকারি, প্রতিষঠানগুলোর কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে গেছে ইদানিং। জামাকাপড় পোশাক, শাড়ি প্রস্তুতকারি প্রতিষ্ঠান, কারখানা তাঁতি, বুননশিল্পী সবার মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য বিরাজ করছে এখন। ফলশ্রুতিতে গোটা অর্থনীতিতে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে ইতিমধ্যেই। দীর্ঘ দুই বছরের অসহনীয় ব্যবসায়িক মন্দা কাটিয়ে ওঠার চমৎকার সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। উৎসবকেন্দ্রিক বাজার জমে ওঠার মাধ্যমে গোটা অর্থনীতিতে এক ধরনের চাঙাভাব এসেছে। করোনার ধাক্কা কাটিয়ে দুই বছর পর এবার অনেকটা স্বাভাবিক পরিবেশে ঈদকেন্দ্রিক কেনাকাটা শুরু করেছেন সবাই। বর্তমানে অনলাইনেও ঈদের পোশাক বিক্রি হচ্ছে। যেসব বড় প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট ক্রেতাগোষ্ঠী রয়েছে, তারাই অনলাইনে ভাল বিক্রি করতে পারছে। অন্যরা ফেসবুকে বিক্রির চেষ্টা করছে। কিন্তু আমাদের দেশের ক্রেতার বড় অংশই অনলাইনে পোশাক কিনতে ভরসা পান না। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবাই অনুধাবন করতে পেরেছেন, ভবিষ্যতে ব্যবসায় টিকে থাকতে হলে অনলাইনেও জোর দিতে হবে। তবে করোনা মহামারীর বিষয়টি মাথায় থাকায় কোনো কোনো ব্যবসায়ী কিছুটা অনিশ্চয়তা, দ্বিধায় ছিলেন। তারা ঝুঁকি নিয়ে বিপদে পড়তে চাননি নতুন করে। গত দুই বছরের ক্রমাগত মন্দা আর বিপর্যয়ে মূলধন হারিয়ে অনেক ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা বেকায়দায় আছেন। তাদের পক্ষে চেষ্টা থাকলেও বড় ধরনের বিনিয়োগ সম্ভব হয়নি। তারপরও ঈদের বাজারে চাঞ্চল্য ফিরে এসেছে দেখে সবাই খুশি। ঈদের বাজারে তৈরি পোশাক যথাসময়ে সরবরাহের লক্ষ্যে ছোটখাটো বিভিন্ন রেডিমেড গার্মেন্টস কারখানায় ব্যস্ততা বেড়েছে । রাতদিন তাদের কাজ করতে হচ্ছে। ফলে এ খাতে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে, তা বলাই বাহুল্য। করোনা মহামারীর গত দুই বছর পেরিয়ে ঈদ উৎসবে চাঙাভাব ফিরে এসেছে অর্থনীতিতে। সব মিলিয়ে আমাদের অর্থনীতিতে ঈদ উৎসবকে কেন্দ্র করে যে চাঙা ভাব ফিরে এসেছে তা বছরজুড়ে ধরে রাখতে ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র মাঝারি উদ্যোক্তা, সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সবাইকে পারস্পরিক সমন্বয় এবং সহযোগী মনোভাব বৃদ্ধির নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আমাদের অর্থনীতিতে চাঙা ভাব ধরে রাখার স্বার্থে বাজার ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে ভোক্তা অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টিকে বেশ জোর দিতে হবে।
#
লেখক কথাশিল্পী, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও নিয়মিত লেখক
ananno86bolly@arthakagajofficeক
অকা/নিলে/দুপুর, ২৯ এপ্রিল, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

