মারুফা ইয়াসমিন
বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিগুলোর ভূমিকা অনেক। তবে আধুনিক বিশ্বে একটি কোম্পানি কতদিন টিকে থাকবে, তা নির্ভর করে তার সুশাসনের ওপর। একে বলা হয় 'কর্পোরেট গভর্ন্যান্স'। আমাদের দেশে বেশিরভাগ পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি শুরু হয়েছে পারিবারিক ব্যবসার মাধ্যমে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এগুলো শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এগুলো এখন জনমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। কিন্তু নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনো পরিবারের প্রভাব অনেক বেশি। এই ‘পরিবার পরিচালক’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠানের প্রতি মায়া ও দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য নিশ্চিত করে। তবে এটি সুশাসনের পথে অনেক জটিলতাও তৈরি করে। একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি সাধারণ মানুষের টাকা নিয়ে ব্যবসা করে। তাই এর পরিচালনা পর্ষদ কেবল একটি পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। বর্তমানে বাংলাদেশের পুঁজি বাজারে পেশাদারিত্ব ও পারিবারিক ঐতিহ্যের এই দ্বন্দ্ব একটি বড় আলোচনার বিষয়।

বাংলাদেশের পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিগুলোর গঠিত পর্ষদ দেখলে একটি বিশেষ চিত্র পাওয়া যায়। এখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রে চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মতো বড় পদগুলো একই পরিবারের সদস্যদের দখলে থাকে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তালিকাভুক্ত প্রায় ৭০ শতাংশ কোম্পানি কোনো না কোনোভাবে পরিবার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই ব্যবস্থার একটি ভালো দিক আছে। একে বলা হয় ‘স্কিন ইন দ্য গেম’। এর অর্থ হলো ব্যবসায় মালিকদের নিজেদের অনেক বড় বিনিয়োগ থাকে। পরিবার পরিচালকরা প্রতিষ্ঠানটিকে নিজেদের উত্তরাধিকার মনে করেন। তাই তারা কেবল দ্রুত মুনাফা না খুঁজে ব্যবসার দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতাকে গুরুত্ব দেন। তবে এর অন্ধকার দিকটিও বেশ স্পষ্ট। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হওয়ার মূল শর্ত হলো মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা আলাদা থাকা। যখন এক পরিবারের অনেক সদস্য পর্ষদে থাকেন, তখন পেশাদারিত্বের চেয়ে আবেগ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে। অনেক সময় যোগ্যতার চেয়ে রক্ত সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে অযোগ্য ব্যক্তিরা বড় পদে বসে পড়েন। ফলে প্রতিষ্ঠানের নতুন কিছু করার ক্ষমতা বা উদ্ভাবনী শক্তি নষ্ট হয়ে যায়।

তাত্ত্বিকভাবে একে 'এজেন্সি প্রবলেম' বলা হয়। এখানে মূল মালিক বা পরিবারের সঙ্গে সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়। হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউয়ের একটি গবেষণা অনুযায়ী, যেসব পারিবারিক কোম্পানি পেশাদার হতে পারে না, তাদের স্থায়িত্ব কম। এসব কোম্পানির মাত্র ৩ শতাংশ তৃতীয় প্রজন্ম পর্যন্ত টিকে থাকে। বাংলাদেশেও এমন উদাহরণ অনেক। বড় অনেক গ্রুপ যখনই দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের হাতে পড়েছে, তখন পেশাদারিত্বের অভাব প্রকট হয়েছে। সেগুলো রুগ্ন হয়ে গেছে। তবে ইউনিলিভার বা নেসলের মতো বহুজাতিক কোম্পানির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা সম্পূর্ণ আলাদা। তাই তাদের উন্নতি কখনো থেমে থাকে না। শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া মানেই জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকা। কিন্তু অনেক পরিবার পরিচালকের মধ্যে এই বোধ নেই। অনেক সময় দেখা যায়, কোম্পানির লাভ সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়া হয় না। বরং সেই টাকা পরিবারের অন্য কোনো লোকসানি ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়। আবার মালিকানার অংশ দিতে নারাজ পরিবারকেন্দ্রিক কোম্পানিগুলো। সাম্প্রতিককালে বিষয়টি বেশ লক্ষ্যণীয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এখন আর স্টক ডিভিডেন্ট পায় না। বার্ষিক সাধারণ সভা প্রকাশ্যে হয় না। তা হয় ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীগণ উপস্থিত থাকার পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এটা যেমন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী স্বার্থের পরিপন্থী তেমনি সুশাসন বিরোধী।

আমাদের দেশের অনেক পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি কাগজে-কলমে 'পাবলিক' হলেও আসলে 'প্রাইভেট' মানসিকতায় চলে। সাধারণ বিনিয়োগকারীরা টাকা দিলেও কোম্পানির কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের কোনো ভূমিকা থাকে না। বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) পরিবার পরিচালকদের একক প্রভাব থাকে। এর ফলে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা তাদের কথা বলার সুযোগ পান না। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো নিরপেক্ষ পরিচালক নিয়োগ নিয়ে। নিরপেক্ষ পরিচালক স্বাধীন নন। বরং তারা পর্ষদের আশীর্বাদপুষ্ট। নিরপেক্ষ পরিচালক যদি পর্ষদ প্রধান মানে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হনও তাতে তিনি নিরপেক্ষভাবে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। তাকে উদ্যোক্তা পরিচালক ও অন্য পরিচালকদের কথা অনুযায়ি চলতে হয়। সভাগুলোতে নিয়ম অনুযায়ী পর্ষদের পাঁচ ভাগের এক ভাগ স্বতন্ত্র বা  নিরপেক্ষ পরিচালক থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে অনেক কোম্পানি তাদের বন্ধু বা অনুগত ব্যক্তিদের এই পদে বসায়। ফলে সুশাসন নিশ্চিত করার বিষয়টি একটি প্রহসনে পরিণত হয়। পারিবারিক কলহ যখন বোর্ডরুমে ঢোকে, তখন প্রতিষ্ঠানের কাজের চেইন অফ কমান্ড ভেঙে পড়ে। বাংলাদেশের অনেক বড় গ্রুপ অব কোম্পানির পতনের মূল কারণ ছিল ভাইয়ে-ভাইয়ে, বোনে বোনে বা উত্তরসূরিদের পারস্পরিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব। সাধারণ মানুষের আমানত নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কোনো পরিবারের নেই।

কর্পোরেট সংস্কৃতিতে 'সাকসেশন প্ল্যানিং' বা উত্তরাধিকার পরিকল্পনার অভাব একটি বড় সংকট। বেশিরভাগ পারিবারিক কোম্পানিতে মালিকের পর কে হাল ধরবেন, তা নিয়ে স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা থাকে না। এর ফলে হঠাৎ মালিকের অনুপস্থিতিতে কোম্পানিগুলো দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। উন্নত বিশ্বে পরিবার পরিচালকরা সন্তানদের সরাসরি বড় পদে বসান না। তারা আগে অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অভিজ্ঞতা অর্জনের পরামর্শ দেন। কিন্তু আমাদের দেশে উচ্চপদকে ‘বংশগত অধিকার’ মনে করা হয়। এই সংস্কৃতি মেধাবী কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দেয়। একজন দক্ষ কর্মী যখন দেখেন যে তার ২০ বছরের অভিজ্ঞতার চেয়ে মালিকের অদক্ষ সন্তানের ইচ্ছার দাম বেশি, তখন তিনি চাকরি ছেড়ে দেন। এই মেধা পাচার বা 'ব্রেইন ড্রেন' কোম্পানির নতুন কিছু করার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ক্ষতি বয়ে আনে।

প্রকৃত সুশাসন নিশ্চিত করতে এই অচলায়তন ভাঙ্গা জরুরি। এর জন্য কিছু সাহসী ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রথমত, একটি পর্ষদে এক পরিবারের কতজন সদস্য থাকতে পারবেন, তার সীমা নির্দিষ্ট করতে হবে। বর্তমানে ২০ জন পরিচালকের মধ্যে ৪ জন একই পরিবারের হতে পারেন। এটি কমিয়ে ২ জনে আনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, স্বতন্ত্র বা নিরপেক্ষ পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি স্বাধীন হওয়া উচিত। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একটি প্যানেল থেকে লটারি বা মেধার ভিত্তিতে তাদের নিয়োগ দিতে পারে। এতে তারা পরিবারের তোষামোদ না করে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে। তৃতীয়ত, সিইও বা ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পেশাদার ব্যক্তি নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা দরকার। পরিবারের বাইরের দক্ষ কাউকে এই দায়িত্ব দেওয়া উচিত। মালিকপক্ষ কেবল বড় নীতিগুলো ঠিক করবেন। অন্যদিকে দৈনন্দিন কাজ পরিচালনার ভার থাকবে পেশাদারদের হাতে।

‘রিলেটেড পার্টি ট্রানজ্যাকশন’ বা পরিবারের অন্য ব্যবসার সঙ্গে লেনদেনের জন্য বিশেষ নিরীক্ষা দরকার। প্রতিটি লেনদেনের পেছনে সঠিক কারণ থাকা চাই। বাজারমূল্য যাচাই করার জন্য তৃতীয় পক্ষের সার্টিফিকেট নেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত। অনেক সময় দেখা যায়, মূল কোম্পানি মালিকের নিজের দোকান বা প্রতিষ্ঠান থেকে কাঁচামাল কেনে। সেই কাঁচামালের দাম বাজারের চেয়ে অনেক বেশি দেখানো হয়। এটি আসলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার একটি কৌশল। পুঁজি বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার উচিত একটি ডিজিটাল মনিটরিং সিস্টেম চালু করা। এতে কোনো বড় লেনদেন সুশাসনের নিয়ম ভাঙলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ধরা পড়বে। এটি বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখবে।

কর্পোরেট সংস্কৃতির ওপর পরিবার পরিচালকদের প্রভাব অনেক গভীর। যখন কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ্যতার চেয়ে কেবল পদবিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, তখন দক্ষ কর্মীরা সেখানে থাকতে চান না। মেধাবী তরুণরা এখন বহুজাতিক কোম্পানিতে কাজ করতে পছন্দ করেন। কারণ সেখানে যোগ্যতার ভিত্তিতে উপরে ওঠার সুযোগ থাকে। কিন্তু পারিবারিক কোম্পানিতে চিত্রটি ভিন্ন। অনেক সময় দেখা যায়, মালিকের সন্তান বিদেশ থেকে পড়ে এসেই অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের ওপর হুকুম দিতে শুরু করেন। এই সংস্কৃতি দেশের মেধা পাচারের অন্যতম একটি কারণ। একটি সুস্থ কাজের পরিবেশ তৈরি করতে হলে ‘মেধাভিত্তিক নেতৃত্ব’ বা মেরিটক্রেসি প্রয়োজন। পরিবার পরিচালকদের বুঝতে হবে যে, প্রতিষ্ঠান বড় করতে হলে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে হয়। স্যামসাং, টাটা বা ফোর্ডের মতো বড় কোম্পানিগুলো পারিবারিক ব্যবসা হিসেবে শুরু করেছিল। কিন্তু তারা আজ বৈশ্বিক ব্র্যান্ড কারণ তারা সময়মতো পেশাদারিত্বকে গ্রহণ করেছে। টাটা গ্রুপের ‘টাটা সন্স’ একটি দারুণ উদাহরণ। তাদের বোর্ড অফ ডিরেক্টরসে পেশাদারদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। এছাড়া তারা লাভের বড় অংশ জনকল্যাণে ব্যয় করে।

বাংলাদেশেও ওয়ালটন, স্কয়ার বা অ্যাপেক্স-এর মতো কিছু ভালো উদাহরণ আছে। এই কোম্পানিগুলো সুশাসন মেনে চলে। তারা মালিকানার চেয়ে ভালো কাজের বা পারফরম্যান্সের গুরুত্ব বেশি দেয়। তবে সব জায়গার চিত্র এখনো সন্তোষজনক নয়। বিশেষ করে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোতে পরিবারের প্রভাব অনেক বেশি। এই আধিপত্য চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। এর মাশুল এখন পুরো রাষ্ট্রকে দিতে হচ্ছে। বেক্সিমকো বা এস আলম গ্রুপের সাম্প্রতিক সংকট আমাদের একটি বড় শিক্ষা দিয়েছে। পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ যখন জবাবদিহিতার বাইরে চলে যায়, তখন তা দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। এটি আমাদের জন্য একটি বড় সতর্ক বার্তা।

পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিবার পরিচালকদের থাকা কোনো অপরাধ নয়। বরং তাদের অভিজ্ঞতা ও নিষ্ঠা কোম্পানির জন্য সম্পদ হতে পারে। তবে এই উপস্থিতি যেন সুশাসনের পথে বাধা না হয়। পরিবারকে প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রক নয়, বরং পথপ্রদর্শক হতে হবে। ২০২৬ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমাদের কর্পোরেট খাতকে আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করতে হবে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন বা উন্নয়নশীল দেশে রূপান্তরের পর টিকে থাকতে হলে আন্তর্জাতিক মানের সুশাসনের কোনো বিকল্প নেই। নীতি নির্ধারক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সবার চেষ্টাই পারে পারিবারিক প্রভাবমুক্ত একটি আধুনিক ও জবাবদিহিমূলক কাজের পরিবেশ তৈরি করতে। একটি কোম্পানির পরিচয় কেবল মালিকের নামে হওয়া উচিত নয়। বরং এর কাজ সুশাসনের; সে মানেই পরিচয় হওয়া উচিত। তা হলে  আমাদের পুঁজি বাজার প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী হবে। স্বচ্ছ সুশাসন ও পেশাদারিত্বই সমৃদ্ধ অর্থনীতির মূল ভিত্তি। পরিবার পরিচালকরা যদি নিজেদের ‘মালিক’ না ভেবে ‘আমানতদার’ বা ট্রাস্টি মনে করেন, তবেই দেশের শিল্প খাতে নতুন দিগন্ত সূচিত হবে। 

বিশ্লেষণ লেখকের নিজস্ব

লেখক কলাম লেখক ও বেসরকারি একটি কোম্পানির মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা
antmail00111@gmail.com

সর্বশেষ হালনাগাদ 12 hours আগে

Leave A Reply

Exit mobile version