প্রণব মজুমদার
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটি নাটক লিখেছিলাম। শুরুর দৃশ্যপট ছিল মোরগ মুরগী এক বিক্রেতাকে নিয়ে। বিক্রেতার ডান হাতে জীবন্ত দু’ প্রাণ । ঘুরে ঘুরে হাঁক দিচ্ছেন। অ্যাই ভালো মুরগী! মুরগী রাখবেননি। এক মহিলা ক্রেতা পথে থমকে দাঁড়ালেন। তিনি বিক্রেতাকে জিজ্ঞাসা করলেন তার ডান হাতের মোরগ দু’টির দাম! মোরগগুলো উপরে তুলে তার দিকে চেয়ে বিক্রেতা ছেলেটির উত্তর -আমন্নের জন্য যান পাসসো টাকা কম! এক দাম সাড়ে ৩ হাজার ট্যাহা! দাম শুনে মহিলা বিচলিত হলেন না। মনে মনে ভাবলেন সস্তাই মোরগগুলো! তিনি কত দিতে পারবেন বিক্রেতার প্রশ্নের উত্তরে বললেন ছেলেকে স্কুল থেকে আনার সময় হয়ে গেছে ভাই! আপনি কাল সকালে আসেন! ওই যে আমার বাসা! তবে কম রাইখখেন।
‘দামের বাজার’ নাটকের কাহিনী লেখা হয়েছিল ক্রমবর্ধমান পণ্য বাজারের আগামী সময়কে ঘিরে। দিনদিন মূল্যস্ফীতির সেই বাস্তবতা আজ যা দৃশ্যমান। পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়ছে তো বাড়ছেই। মূল্যের স্ফীতি হচ্ছে। বর্ধিত মূল্য অর্থনীতি সম্পর্কে জন্মদাতা পিতার প্রায় সময়ের ব্যক্ত সংলাপ ছিল ‘ওরা (বাঁশের তৈরি মাথা বহনযোগ্য পাত্র) ভইরা ট্যাকা নেও, জেব (পকেট) ভইরা জিনিস আনো’ এখন যেন তা সত্যসিদ্ধে পরিণত হয়েছে। দ্রব্যের কাছে টাকার কোন দাম নেই!
সীমিত আয়ের সৎ মানুষেরা আজ যেন দেশে সংখ্যালঘু! বিক্রেতার কাছে এ শ্রেণির ক্রেতারা মূল্যহীন ও অপাংক্তেয়! কেনাবেচায় তাদের কাছে সৎ ও অসৎ ক্রেতা প্রাধান্য পায় না। অগ্রাধিকার কাড়ি কাড়ি টাকাওয়ালারা। যে ক্রেতা দর কষাকষি করেন না, তারাই বিক্রেতার কাছে মূল্যবান।
যারা নিয়মিত বাজার করেন, তারাই দেশের নিয়ন্ত্রণহীন বাজার ব্যবস্থাপনার অভ্যন্তরে থেকে কষ্টের তীব্রতাটুকু অনুভব করেন। ক্রমবর্ধমান মূল্য দিতে গিয়ে নাভিশ্বাস ওঠেন। হা পিত্তেশ করেন! ভাবেন সম্রাট আকবরের মুঘল আমল যদি ফিরে আসতো! যদিও জনস্রোতের মধ্যে চাহিদা ও সরবরাহ বিষয়ক অর্থনীতির সূত্র অকার্যকর!
উর্ধ্বগতির পণ্য বাজারের চাপে দাম কমে গেছে স্বল্পমানের কাগজী ও ধাতব মুদ্রার। বিষয়টি লক্ষ্য করছি ৫/৬ বছর ধরে।
মহানগরীর মিরপুর ১০ নম্বর গোল চক্কর। ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরের এক বিকেল। বাসে উঠে বা দিকে জানালার পাশে বসেছি। গন্তব্য দৈনিক বাংলার মোড়। সুঠাম দেহের ষাটোর্ধ্ব মহিলা প্লাস্টিক বাটি উচু করে বলছেন - ‘স্যার দশটা টেকা দেন না একটা রুডি খামু।’ দিলাম পাঁচ টাকা মূল্যমানের একটা কয়েন। ভিক্ষুক মহিলা রেগে গিয়ে প্রশ্ন করেন এইডা কী দিলেন? এইডা এহন কেউ নেয়? আমিতো রীতিমত হতচকিত! ‘সিটিং বাস’ থেকে নামবো নামবো ভাবছি সে সময়ই প্রায় যাত্রী ভর্তি বাসটা মতিঝিল অভিমুখে রওনা দিল। ভিক্ষুক মহিলার কথাগুলো আমাকে তাড়িয়ে বেড়ালো। ঠিকই তো! দেশে ধাতব কিংবা স্বল্পমানের মুদ্রার কি মূল্য আছে! কি পাওয়া যায় দুই টাকা কিংবা পাঁচ টাকায়? আজকাল রাস্তার ফকিরও তা নিতে চায় না! ফুটপাতের তরকারি বিক্রেতা বা অন্য পণ্যের ভ্যানওয়ালা বিক্রেতাও আজকাল ধাতব পয়সায় মূল্য পরিশোধে ক্রেতাকে ভৎসনা করে। কিন্তু আমাদের মতো সীমিত উপার্জনকারি মানুষ বা ভোক্তার কাছে এক টাকা, দুই টাকা ও পাঁচ টাকার কাগজী বা ধাতব মুদ্রা সবই মূল্যবান। সময়ের ধারাবাহিকতায় এক টাকার গচ্ছিত সঞ্চয় একশ’ টাকায় পরিণত হয়। ভবিষ্যত বিপদমুক্ত নিরাপত্তার দিকটি অনেকের মতো আমাকে শিক্ষাদান করেছেন আমার জন্মদাত্রী মা।
ক্রমবর্ধমানশীল বাজার ব্যবস্থায় অন্যায় দেখলে আমার বেশ ক্ষোভ হয়। বাজার বা দোকানে প্রায়ই অসাধু বিক্রেতা বা দোকানীদের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ করি। মাঝে মাঝে অনভিপ্রেত অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে।
অনিয়মের পরিমাণ সমাজে এতটাই বেড়েছে যে অনিয়মই আজ যেন আমাদের নিয়ম। বিক্রেতা বা সেবাদানকারি প্রাপ্য খুচরা টাকা ফেরত দিতে চায়ই না। তবে কেনাবেচায় খুচরার সংকটে দুই এক কম অর্থ নিতে তারা মোটেও রাজী নন। বেশিরভাগ বিপনীতে অকার্যকর সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য (গজচ) এবং মেয়াদীত্তীর্ণ পণ্যের কথা নাই বা বললাম।
মহানগরে বসবাস এবং নিয়মিত যাতায়াতে যানবাহন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কষ্টার্জিত সঞ্চয় ও ব্যাংক ঋণের (৬ বছর মেয়াদী মাসিক কিস্তিতে পরিশোধযোগ্য) অর্থায়ন নিয়ে ২০১১ সালে একটি রিকন্ডিশন ব্যক্তিগত টয়োটা গাড়ি ক্রয় করি। সাশ্রয়ের কথা বিবেচনা করে জ¦ালানী গ্যাসে গাড়িটিকে রূপান্তর করি শুরুতেই। সাধারণত একদিন পরপর জ্বালানি গ্যাসের জন্য মহানগরের পাম্পে যেতে হয়। অকটন তেলের জন্য গড়ে মাসে গড়ে দু’ বার। পাম্প থেকে জ¦ালানি নিতে গিয়ে ১২ বছরে আমার পাম্প জ্বালানি বিক্রেতাদের সম্পর্কে অভিজ্ঞতা একই। অন্যায় বা অনিয়ম যেন এখানেও প্রতিষ্ঠিত নিয়ম। গ্যাস চাপ কমের বিড়ম্বনা তো থাকেই। পাম্পে সংগ্রহকৃত মোট ঘনফুটের গ্যাসের দাম ধরুন মূল্য তালিকার ডেস বোর্ডে ওঠেছে ৪৩২ টাকা ৫ পয়সা। দায়িত্বরত ব্যক্তি রশিদে লিখবে ৪৩৩ টাকা। ৯৫ পয়সা বেশি এখানেই। তারপর মূল্য পরিশোধের জন্য নগদ কাউন্টারে গেলে তা ৪৩৫ টাকা হয়ে যায়! কাউন্টারের লোক বলবে ভাংতি নেই। ভাংতি দিন। লাইনের লোকগুলো বকশিস চায়! সে বিড়ম্বনা তো আছেই। এই যে বাড়তি টাকা বা পয়সা আদায় করা হয় প্রতিদিন; হিসাব নিকাশ শেষে তা পাম্পওয়ালাদের পকেটে ঢুকে। অবৈধ রোজগার! রাজধানীর অনেক জ্বালানি পাম্পে দাহ্য পদার্থে ভেজাল দ্রব্য মিশানো হয়। ক’দিন আগে রমনা মৎস্য ভবনের কাছে একটি পাম্পে অকটনে কেরোসিনের গন্ধ পাওয়া যায়। ওই অকটনে চালিত গাড়ি বেশ ক’বার বন্ধ হয়ে যায়। পরে বের হলো ভেজালের রহস্য। সরকারের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ এবং বিস্ফোরক পরিদপ্তরের নিয়োজিত লোকজন কি আর ভোক্তা বঞ্চনার এসব অন্যায় আচরণ দেখেন?
তিন মাস আগে সন্তানের জন্য জুতা কিনতে শান্তিনগর বাটার শোরুমে গিয়েছি। জুতা জোড়ার দাম ৬৯৫ টাকা। কাউন্টারে ১ হাজার টাকার একটি নোট দিয়েছি। ব্যবস্থাপক রশিদ ও ফেরত ৩০০ টাকাসহ জুতার ব্যাগটি হাত ধরিয়ে দেন। বললাম ৩০৫ টাকা তো পাবো? তিনি বললেন ভাংতি নাই! আগে ফেরতযোগ্য খুচরা টাকার বদলে চকলেট বা ক্যান্ডি দেয়া হতো। সেটা উঠে গেছে। ক্রেতা বা ভোক্তার পাওনা এ খুচরা টাকা যেন বিক্রেতা বা সেবাদানকারির! যেখানে ক্রেতা অসহায়। অধিকারহীন!
ক্রেতা হিসেবে সবচেয়ে খারাপ লাগে যখন কষ্টার্জিত উপার্জনের সীমিত অর্থ বিক্রেতা ছিনিয়ে নেয় অন্যায়ভাবে। উল্লেখিত ঘটনাগুলো প্রায়ই ঘটছে। এমন ঘটনা থেমে নেই দেশের সুপার শপগুলোতেও, যেখানে আধুনিক ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইজ (ইএফডি) পদ্ধতির ব্যবহৃত সফটওয়্যারের মাধ্যমে কম্পিউটারইড বিল হয়। পাম্পের মতো সুপারশপেও বিলের ক্ষেত্রে দেখি পয়সা টাকায় পরিণত হয়ে যায়! এসব দেখভাল করার সরকারি অনেক দফতর ও লোকবল। জনগণের করের টাকায় দেশ পরিচালিত হয়। অথচ আমরা জনগণ প্রতারিত হচ্ছি। ঠকছি! বঞ্চিত হচ্ছি প্রতিনিয়ত।
ধাতব মুদ্রা ও খুচরা টাকা নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির শেষ নেই! ভোক্তা হিসেবে যার মাথা, তারই যেন ব্যথা! অল্পমানের কাগজী মুদ্রা ছাপানো এবং ধাতব মুদ্রা বের করা সরকারের পক্ষে কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব সেই বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রা প্রকাশ করতে বেশ গলদঘর্ম। সংশ্লিষ্ট মূল্যমানের মুদ্রা প্রকাশে অনেক সময় দ্বিগুণ অর্থ খরচ হয়। সমাজে লেনদেনে খুচরা টাকা বা ধাতব পয়সার যখন মূল্যহীন তখন ভূক্তভোগী ক্রেতা হিসেবে আমি কি বলবো এসব মুদ্রা বের করায় অর্থহীন ব্যয় হচ্ছে?
অর্থনীতিবিদরা বলবেন, দ্রব্যমূল্যের মূল্যস্ফীতির জোয়ারে কম মূল্যমানের দাম থাকে না। এটাই অর্থনীতির নিয়ম। কিন্তু অর্থশাস্ত্রের ছাত্র হিসেবে বলি, অবকাঠামোগত সরকারি নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাপনাই পারে এর সমাধান দিতে। তাছাড়া উৎপাদন কাঠামো জোরদারে সবাইকেই নজর দিতে হবে।

#

লেখক সব্যসাচী লেখক ও অর্থকাগজ সম্পাদক
writerpranabmajumder@gmail.com
অকা/নিলে/দুপুর, ২৯ এপ্রিল, ২০২২ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 4 years আগে

Leave A Reply

Exit mobile version