প্রণব মজুমদার

এখনও আমাদের প্রধান রফতানি পণ্য তৈরি পোশাক খাত। প্রতি বছর তৈরি পোশাক খাত থেকে মোট রফতানির সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ আয় আসে। দেশে তৈরি পোশাক খাতে ৫০ লাখ ১৭ হাজার ৬৫২ জন শ্রমিক রয়েছে। এ হিসাব শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের। রফতানিমুখী পোশাক কারখানার মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর তথ্য (বায়োমেট্রিকস ডেটাবেজ অনুসারে) অনুযায়ী, বাংলাদেশে তৈরি পোশাক কারখানায় ৩৩ লাখ ১৭ হাজার ৩৯৭ জন শ্রমিক রয়েছে। এর মধ্যে ৫২ দশমিক ২৮ শতাংশই নারী শ্রমিক। সংখ্যার হিসাবে নারী শ্রমিক রয়েছে ১৭ লাখ ৩৪ হাজার ৪৫৯ জন। অন্যদিকে নিট বা গেঞ্জি–জাতীয় পোশাক উৎপাদন পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, নিট সেক্টরে রয়েছে ১৭ লাখ ২৫৫ জন শ্রমিক। যার ৬২ শতাংশ অর্থাৎ ১০ লাখ ৫৪ হাজার ১৫৭ জনই নারী। সব মিলিয়ে দেশে তৈরি পোশাক খাতে ৫০ লাখ ১৭ হাজার ৬৫২ জন শ্রমিক রয়েছে। যার ৫৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ অর্থাৎ ২৭ লাখ ৮৮ হাজার ৬১৬ জন নারী শ্রমিক। পরিসংখ্যানটি প্রায় ২ বছর আগের। সে উপাত্ত অনুয়ায়ী দেশে পোশাক খাতে নারী শ্রমিকই বেশি। যাদের বেশির ভাগ শ্রমে আমাদের অর্থনীতির প্রধান খাত উজ্জ্বল; তারাই মালিকদের চরম শ্রম শোষণের শিকার। নারীরা চরমভাবে মজুরি বৈষম্যের শিকার হন সবসময়। নারী শ্রমিকরা এখন বহুমাত্রিক কাজ করছেন। সাধারণত আমরা নারী শ্রমিকদের কেবল গৃহকর্মী হিসেবেই দেখে অভ্যস্ত। বর্তমানে নারীদের আয়ের পথ প্রসারিত হয়েছে। তৈরি পোশাক কারখানায় নারী শ্রমিকের আধিক্যে নগরে গৃহকর্মীর বেশ অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। কম শ্রমে বেশি বেতনে গৃহকর্মী রাখতে হয় ইদানিং। তাদের চাহিদা বেড়েছে বলে গৃহকর্মীর কাজে ফাঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে। মহানগরে একজন কাজের মেয়ে ৫/৬টি পরিবারে গৃহ কাজ করে রোজগার করছে মাসে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা।

আমাদের দেশে শ্রমজীবী নারীদের সবচেয়ে বড় অংশের বসবাস গ্রামাঞ্চলে। নারীরা শুধু চাকরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি। তারা স্বামী, সন্তান ও পরিবারকে সামাল দিয়ে রাস্তাঘাট, কৃষিকাজ, মাটিকাটা, মালামাল বহন, চাতালের কাজ, সড়ক নির্মাণের কাজ, জোগালি, ইট ভাটাসহ ছোট-বড় কারখানায় কাজ করছেন। পুরুষের সমান কাজ করে বহুবিধ প্রতিকূলতাকে তুচ্ছ জ্ঞান করেই শ্রম বাজারে নারীকে টিকে থাকতে হচ্ছে।

ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দরিদ্র পরিবারের গৃহবধূ থেকে শুরু করে ঘরের কিশোরী মেয়েরাও নারী শ্রমিক হিসেবে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে নিজেকে যুক্ত রেখেছেন কাজে। নারী উন্নয়নের এ সময়ে শ্রমজীবী নারীরা অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছেন শ্রমের যথাযথ মূল্যায়নের অভাবে। কর্মজীবী নারী শ্রমিকদের একেক জনের জীবনের গল্পও একেক রকমের। পুরুষশাষিত সমাজে নিজেরাও পরিবারের ভাগ্য বদলাতে পুরুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গ্রামীণ সড়ক মেরামতের কাজ করতে দেখা যায় নারীদের। তাদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, নারী শ্রমিকের জীবন সংগ্রামের দুর্বিষহ যাতনার কথা।

কথা হয় ময়মনসিংহের স্থানীয় নারী শ্রমিক ছায়া রানীর সঙ্গে। তিনি জানান, সাত বছর আগে তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি অর্ধাহারে অনাহারে কোনো রকমে জীবনযাপন করতে থাকেন। তিন সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে অভাবের কারণে ময়মনসিংহ থেকে মুন্সীগঞ্জ চলে আসেন কাজের খোঁজে। তিনি দিনমজুরি রাস্তা মেরামতের ইট ও বালু বহনের কাজ নেন এখানে। ছায়া রানী আরও বলেন, ‘রোদ কিংবা বৃষ্টিতে ভিজে পুরুষের সমান কাজ করি। পুরুষের সমান কাজ করেও আমরা শুধু নারী হওয়ায় মজুরি কম পাই।’ একজন পুরুষ শ্রমিক যেখানে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা মজুরি পান, সেখানে নারী শ্রমিক পাচ্ছেন মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। অপরদিকে মুন্সীগঞ্জে বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়ে ফসলি মাঠ থেকে ধান তোলার কাজ শুরু হয়েছে। সেখানেও দেখা মেলে নারী শ্রমিকদের। দাবদাহে মানুষের নাভিশ্বাস উঠলেও রোদে পুড়ে ধান থেকে চাল উৎপাদনে ব্যস্ততা বেড়েছে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের। ঘরের কাজ সেরে ভালোভাবে জীবনযাপনের আশায় নারীরা পুরুষের পাশাপাশি ধান খেত ও চাতালে কাজ করেন। তিনিও মজুরির ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার! নারী শ্রমিক বিলকিস বেগম বলেন, ‘সারাদিন কাজ করার জন্য একজন পুরুষ শ্রমিক যেখানে ন্যূনতম ৫০০ টাকা পেয়ে থাকেন সেখানে আমরা পাই ৪০০ টাকা।’

কথা হয় ইট ভাটায় শ্রম বিক্রি করা নারীদের সঙ্গে। মজুরি কেমন জানতে চাইলে মনোয়ারা বেগম আক্ষেপ করে বলেন, ‘আমাদের জীবন ইটের মতো পোড়া জীবন!’ সংসারের অভাব অনটন আর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে ইটভাটায় দিনে ৩০০ টাকার রোজগারে চলে তার সংসার। ২ শিশু সন্তানকে সঙ্গে নিয়েই কাজ করতে হয় তাকে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইট ভাটায় প্রতিদিন পুরুষের চেয়ে বেশি কাজ করেও নারী হওয়ার মজুরি বৈষম্যের শিকার হয়ে অবহেলিত আমরা।’ শুধু ছায়া রানী, বিলকিস বেগম ও মনোয়ারা বেগমই নয়। সারা দেশে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর লাখ লাখ নারী শ্রমিক মজুরি বৈষম্যর শিকার। এদেশে নারী শ্রমিকদের শ্রমের মূল্য বাড়েনি অথচ সময়ের সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধির কারণে তাদের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ছে। পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারী শ্রমিকের মজুরি কম হওয়ায় বিশেষ করে প্রান্তিক জনপদগুলোতে নারী শ্রমিকের চাহিদা বাড়ছে। ঘরে-বাইরে দ্বৈত বোঝা বয়ে বেড়ান নারী। সমাজ কতটুকু মূল্যায়ন করে তাদের শ্রমের এ প্রশ্ন উঠতেই পারে! শুধু বছর ঘুরে মে দিবস আসলে নারী শ্রমিকদের মজুরি-বৈষম্যর বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু তাদের মজুরির কোনো পরিবর্তন হয় না।

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া নতুন কাঠামো অনুযায়ী, বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২,৫০০ টাকা। এর মধ্যে মূল বেতন ৮,০০০ টাকা, বাড়ি ভাড়া ৪,০০০ টাকা, চিকিৎসা ভাতা ১,২৫০ টাকা, এবং যাতায়াত ও খাদ্য ভাতা মোট অঙ্কের অন্তর্ভুক্ত। ২০২৪ সাল থেকে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার ৫% থেকে বাড়িয়ে ৯% করা হয়। কিন্তু সব পোশাক কারখানা মালিক সরকার নির্ধারিত সে মজুরি দেন না। বরং মাসের পর মাস ন্যূনতম মজুরি ও বোনাস বকেয়া থাকে। নারী শ্রমিকদের নানা রকম হয়রানিতে আছেই। দেশে ছোট মিলিয়ে পোশাক কারখানা প্রায় ৫ হাজার। এ সংখ্যার মধ্যে আইএলও (আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা) সনদ অনুযায়ী বিল্ট ইন ফ্যাক্টরির বা পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যা মাত্র ২২৯টি। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার পরিবেশবান্ধব কারখানা মানে কর্মরত শ্রমিকদের ন্যায্য বেতন ও মজুরি, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ জীবন রক্ষা এবং নারী শ্রমিকদের মাতৃকালীন ছুটি-ভাতা এবং শিশু সন্তান পালনে ‘ডে কেয়ার’ নিশ্চিতকরণ উত্তম একটি ব্যবস্থা। মূল্যস্ফীতির বাস্তবতায় মাসিক ন্যূনতম বেতন ৩০ হাজার টাকা পুনর্নির্ধারণ এবং প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বেতন বাড়ানোসহ ৬ দফা দাবি জানিয়েছে দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মচারীরা অতি সম্প্রতি।

২০২৫ সালে ২৬০টি শ্রমিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় ১৬৮ জন কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করেছে। এ তথ্য হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) এর। ৩০ এপ্রিল সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক বিশেষ আলোচনা সভায় এক প্রবন্ধে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। সভায় দেশের শ্রমজীবী মানুষের বর্তমান অবস্থা, কর্মক্ষেত্রে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত মাত্র তিন মাসেই ১৩৯টি ঘটনায় ৭২ জন শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারিয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। তাদের মতে, টেকসই উন্নয়নের জন্য শ্রমিকদের মর্যাদা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে বক্তারা।

দেশের তৈরি পোশাক কারখানায় কর্মরত ৯০ ভাগই নারী; সকাল থেকে রাত ৮-১০টা পর্যন্ত কাজ করতে হয়, পুষ্টিগত বিচারে তারা শারীরিকভাবে দুর্বল ও অসুস্থ। অনেকের ভাগ্যে জোটে না মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা। চাকরি বাঁচানোর জন্যে অসুস্থ শরীরেও কাজ করতে হয়। নেই পেনশন স্কীমের ব্যবস্থা। উৎপাদন কম হলে সইতে হয় নির্যাতন।

ঢাকার সাভারে গ্রিন টেক্সটাইল গার্মেন্টসে কাজ করেন নিলুফার ইয়াসমিন নামের এক নারী শ্রমিক। সারা মাস কাজ করে যে বেতন পান, তা বাবা-মায়ের হাতে তুলে দেন। নিলুফার বলেন, গার্মেন্টসে কাম কইর‌্যা নিজের পায়ে দাঁড়াইছি। এখন নিজের দরকারে টাকা খরচ করতে কারও কাছে কৈফিয়ত দিতে হয় না। নিজের ইচ্ছামতো বাবা-মাকে দেখাশোনা করতে পারি। সন্তানরে লেখাপড়া শিখাইয়্যা একজন ভালো মানুষ হিসাবে গইড়্যা তোলার স্বপ্ন দেখি। গার্মেন্টস শিল্প মানুষের জীবন বাঁচাইতাছে। নিলুফার আরও বলেন, গার্মেন্টস যেমন আমাগো জীবন বাঁচাইতাছে, তেমনি অনেক সমস্যাও আছে। কাম করতে করতে পেরেশান হইয়া যাই। ছুটি চাইলে ছুটি পাই না। তিন দিন কামে না গেলে চাকরি চইল্যা যায়। অসুস্থ শরীরে কাম করতে না পারলে, দুই পিস মাল কম তৈরি হইলে বলে, তোমার আর কাম করতে হইবো না, গেট খোলা আছে, চইল্যা যাও। পাঁচ-দশ পিস মাল কম বানাইলে নির্যাতন করে। গার্মেন্টসে এর বিচার তো নাই-ই, উল্টা চাকরি চইল্যা যায়। সুপারভাইজার বলে, ‘কী করতে পারবি, কিছুই করতে পারবি না।’ আমরা অসুস্থ হইলে মেডিকেলও নাই। গার্মেন্টসে কাম করি বইল্যা রাস্তা দিয়া চলাফেরায় নিরাপত্তা নাই। বেডারা খারাপ দৃষ্টিতে তাকায়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলাইয়া কাম কইর‌্যা টাকা রোজগার করি, আর মানুষ খারাপ চোখে দেখবো এইটা মোটেও ঠিক না।’ এ রকম সত্য ঘটনা অনেক গার্মেন্টসেরই প্রাতাহিক চিত্র। নির্যাতন ও শোষণ চলছেই। 

নারীদের মজুরি বৈষম্য কমিয়ে আনতে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন। তাদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। বৈষম্য দূর হলে নারীদের জীবন-মান যেমন উন্নত হবে তেমনি দেশের উন্নয়ন তরান্বিত হবে। সকলকে বুঝতে হবে বিশ্ব বাজারে তুলনামুলক আমাদের সস্তা শ্রমে দেশের অর্থনীতির প্রধান এ খাতকে ধরে রাখার বিকল্প আপাতত দেখছি না।

লেখক: অর্থনীতির বিশ্লেষক ও অর্থকাগজ সম্পাদক

reporterpranab@gmail.com

 

সর্বশেষ হালনাগাদ 56 minutes আগে

Leave A Reply

Exit mobile version