রুনা হোসেন>
বাংলাদেশ আবারও প্রমাণ করেছে, খাদ্য উৎপাদন ও মজুদের ক্ষেত্রে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। সরকারি গুদাম ও সাইলোতে এখন প্রায় ২৩ লাখ ৫০ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ২০ লাখ টনের বেশি চাল। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মজুদ।
এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। কারণ কয়েক দশক আগেও খাদ্য ঘাটতি, আমদানিনির্ভরতা আর দুর্যোগের সময় খাদ্য সংকট ছিল বড় উদ্বেগের বিষয়। আজ সেই বাংলাদেশ শুধু নিজের চাহিদাই পূরণ করছে না, বরং প্রয়োজনের চেয়েও বেশি খাদ্য মজুদ রাখতে পারছে। এটি কৃষকের পরিশ্রম, সরকারের সংগ্রহনীতি এবং খাদ্য ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক ফল।
কিন্তু এই সাফল্যের মাঝেও একটি প্রশ্ন থেকেই যায়। সরকারি গুদাম যখন চালে ভরা, তখন বাজারে চালের দাম এত বেশি কেন?
এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সরকারি গুদামে থাকা চালের বড় অংশ দুর্যোগ মোকাবিলা, ওএমএস, ভিজিডি, ভিজিএফ ও অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য সংরক্ষিত থাকে। তাই এই চাল সরাসরি বাজারে আসে না। অন্যদিকে বাজারের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন মিল মালিক, পাইকারি ব্যবসায়ী ও বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। ফলে সরকারি গুদামে রেকর্ড মজুদ থাকলেও সাধারণ মানুষ তার সুফল সব সময় পান না।
বর্তমান বাস্তবতা হলো, উৎপাদন ভালো হয়েছে, সরকারও পর্যাপ্ত চাল সংগ্রহ করেছে, বিদেশ থেকেও তেমন আমদানি করতে হচ্ছে না। তারপরও চালের দাম কমছে না। বরং গত কয়েক মাসে সব ধরনের চালের দাম বেড়েছে। এর অর্থ বাজারে কোথাও না কোথাও ভারসাম্যের ঘাটতি রয়েছে। বাজার তদারকি দুর্বল হলে বা অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিলে ভোক্তাকেই তার মূল্য দিতে হয়।
খাদ্য নিরাপত্তা বলতে শুধু গুদাম ভরে রাখাকে বোঝায় না। প্রকৃত খাদ্য নিরাপত্তা তখনই নিশ্চিত হয়, যখন কৃষক তার উৎপাদনের ন্যায্য দাম পান এবং সাধারণ মানুষও সহনীয় দামে খাদ্য কিনতে পারেন। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
রেকর্ড মজুদের আরেকটি বড় সুফল হলো, এখন বিদেশ থেকে খাদ্যশস্য আমদানির চাপ অনেক কমেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। আবার বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা অন্য কোনো দুর্যোগ দেখা দিলে সরকার দ্রুত খাদ্য সহায়তা দিতে পারবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে এটি নিঃসন্দেহে বড় স্বস্তির বিষয়।
তবে শুধু গুদাম বড় করলেই হবে না। বাজার ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী করতে হবে। চালের বাজারে কারসাজি ঠেকাতে নিয়মিত নজরদারি, প্রয়োজন হলে ওএমএস কার্যক্রম আরও বাড়ানো এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কৃষক যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তা যেন অযৌক্তিক দাম না দেন—সেই ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে।
বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে সফল হয়েছে। এখন সেই সাফল্য মানুষের দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছে দেওয়ার সময়। কারণ রেকর্ড খাদ্য মজুদের আসল মূল্য তখনই, যখন বাজারে চালের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে থাকে।
সরকারি গুদাম ভরা—এটি অবশ্যই সুখবর। কিন্তু মানুষের থালায় যদি সেই স্বস্তি না পৌঁছায়, তাহলে এই অর্জন পূর্ণতা পাবে না। খাদ্য নিরাপত্তার প্রকৃত অর্থ হলো, দেশের গুদাম যেমন পূর্ণ থাকবে, তেমনি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরও থাকবে নিশ্চিন্ত।
লেখিকা : গণমাধ্যমকর্মী।
সর্বশেষ হালনাগাদ 11 hours আগে


