অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
চট্টগ্রামের শিল্পখাত বর্তমানে তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে, যা উৎপাদন কার্যক্রমে বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। বিশেষ করে ডিজেল সরবরাহে ঘাটতির কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎপাদন কমাতে বাধ্য হতে হচ্ছে, পাশাপাশি বাড়ছে পরিচালন ব্যয়। সংশ্লিষ্ট শিল্পমহলের মতে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পনগরী হিসেবে চট্টগ্রাম বিভিন্ন ভারী শিল্পের কেন্দ্র। এখানে অবস্থিত ইস্পাত, জাহাজ ভাঙা, তৈরি পোশাকসহ নানা খাত সরাসরি জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ডিজেল সরবরাহ কমে যাওয়ায় এসব শিল্পে উৎপাদন ধারাবাহিকতা রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
শীর্ষ ইস্পাত উৎপাদক প্রতিষ্ঠান বিএসআরএম গ্রুপের উদাহরণই পরিস্থিতির গভীরতা স্পষ্ট করে। প্রতিষ্ঠানটির একাধিক কারখানায় প্রতিদিন প্রায় ৩৫ হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয় ভারী যন্ত্রপাতি সচল রাখতে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে তারা প্রয়োজনীয় জ্বালানির অর্ধেকেরও কম পাচ্ছে। ফলে উৎপাদন কমিয়ে আনার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ।
প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা জানান, ইস্পাত শিল্পের মতো ভারী খাতে জ্বালানির বিকল্প নেই। সরবরাহ সংকট দীর্ঘায়িত হলে উৎপাদন ব্যয় আরও বাড়বে, যার প্রভাব পড়বে বাজারমূল্যের ওপর। ইতোমধ্যেই পণ্যের দাম বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা নির্মাণ খাতের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এই সংকট শুধু ইস্পাত শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়। জাহাজ ভাঙা শিল্প, যন্ত্রচালিত লজিস্টিকস এবং অন্যান্য ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও একই সমস্যার মুখোমুখি। সীতাকুণ্ডের একটি জাহাজ পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানে জ্বালানি সংকটের কারণে কার্যক্রম ধীর হয়ে গেছে। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হলেও তারা চাহিদার অর্ধেকও পাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শিল্পখাতে এই সংকটের পেছনে মূল কারণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং এর ফলে সরবরাহ চেইনে বিঘ্নকে দায়ী করা হচ্ছে। পাশাপাশি, আতঙ্কজনিত অতিরিক্ত কেনাকাটা (প্যানিক বায়িং) পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে বাধ্য হয়েছে, যার ফলে অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না।
এদিকে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্পও এই সংকটের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বিদ্যুৎ বিভ্রাট বাড়ছে, আর সেই সময় কারখানাগুলো সাধারণত ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু জ্বালানির অভাবে অনেক কারখানাই লোডশেডিংয়ের সময় উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারছে না।
ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্য সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে শ্রমিকদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন ব্যয় বাড়াচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থানকে দুর্বল করে তুলছে।
অন্যদিকে, শিল্পখাতের এসব অভিযোগের বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি কোম্পানিগুলো ভিন্ন মত পোষণ করছে। তাদের দাবি, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং পূর্ববর্তী চাহিদার ভিত্তিতে সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। তারা মনে করছে, আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত জ্বালানি কেনার প্রবণতাই মূলত সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দেশে ইতোমধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল এসেছে এবং আরও কয়েকটি চালান পথে রয়েছে। পাশাপাশি ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি আমদানিও অব্যাহত আছে, যা আগামী কয়েক সপ্তাহের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে।
সব মিলিয়ে, চট্টগ্রামের শিল্পখাত এখন এক জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে সরবরাহ ঘাটতির অভিযোগ, অন্যদিকে সরকারি সংস্থার আশ্বাস—এই দ্বৈত অবস্থার মধ্যে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকে থাকার জন্য সংগ্রাম করতে হচ্ছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে উৎপাদন, রপ্তানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে। ●
অকা/জ্বা/ই/দুপুর/২৮ মার্চ, ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 12 hours আগে

