অর্থকাগজ প্রতিবেদন ●
বেশ ক’দিন টানা মূল্যবৃদ্ধির পর সংশোধনের শিকার হয়েছে পুঁজি বাজার। তবে ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মূল্যবৃদ্ধি সংশোধনের মধ্যেও সূচক পতন ঠেকিয়ে দিয়েছে। দেশের দুই পুঁজি বাজারে কিছু দিন ধরে দর বাড়তে থাকা কোম্পানিগুলো ২৪ জুলাই ব্যাপক বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে। দর হারানো কোম্পানিগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই মৌলভিত্তিসম্পন্ন। এগুলোর মধ্যে আবার বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও ছিল। তবে এ সময়ে ঢাকা শেয়ার বাজারে লেনদেনের কিছুটা অবনতি ঘটলেও সূচকের উন্নতি ধরে রাখে দুই পুঁজি বাজার। লেনদেনে চমক দেখায় চট্টগ্রাম শেয়ার বাজার।
২৪ জুলাই দেখা যায়, দুই পুঁজি বাজারেই কয়েক দিন ধরে মূল্যবৃদ্ধির ধারায় থাকা কোম্পানিগুলোর একটি বড় অংশই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে। উল্লিখিত সময়ে কোম্পানিগুলোর শেয়ারদর কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১০ থেকে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। ফলে এসব কোম্পানি থেকে বিনিয়োগকারীরা মুনাফা তুলে নিতে গিয়ে বিক্রয়চাপ বৃদ্ধি করেন। দর পতনের শিকার কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিল দেশীয় মৌলভিত্তিসম্পন্ন বেশ কিছু কোম্পানির পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। তবে একই সময় ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল্যবৃদ্ধির ফলে বাজার সূচকের অবনতি ঘটেনি। ২৪ জুলাই এ তিনটি খাতের বেশির ভাগ কোম্পানির মূল্যবৃদ্ধি পায়।
পুঁজি বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, ২৪ জুলাই বাজারে স্বাভাবিক সংশোধন ঘটে। কয়েক দিন যেসব কোম্পানির মূল্যস্তরে বড় পরিবর্তন ঘটে সেগুলোতেই মূলত সংশোধন ঘটে। অন্য দিকে ব্যাংক বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বেশ কিছু কোম্পানির মূল্যস্তর এখনো কোম্পানির বাস্তব অবস্থার তুলনায় অনেক কম। ফলে ২৪ জুলাই এ তিনটি খাতে সংশোধন তো ঘটেইনি বরং মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। তাদের মতে, বাজারে খাতওয়ারি সংশোধন ঘটলে বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি কমানো সহজ হয়। আবার এর মাধ্যমে বাজারও টেকসই হয়ে ওঠে।
প্রধান শেয়ার বাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ২৪ জুলাই ২৮ দশমিক ৯ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ৫ হাজার ৩৬৩ দশমিক ৯৪ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি ২৪ জুলাই দিনশেষে স্থির হয় ৫ হাজার ৩৯২ দশমিক ০৪ পয়েন্টে। তবে লেনদেনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কমপক্ষে দু’বার বড় ধরনের বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারটি। প্রথমে লেনদেনের শুরুতেই এ তৈরি হয় বিক্রয়চাপ। ৫ হাজার ৩৬৩ পয়েন্ট থেকে বিশ মিনিটের মাথায় সূচকটি নেমে আসে ৫ হাজার ৩৫০ পয়েন্টে। লেনদেনের এ পর্যায়ে নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে বেলা সোয়া ১১টায় সূচকটি পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৪১২ পয়েন্টে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি ঘটে প্রায় ৫০ পয়েন্ট। তবে এ পর্যায়ে নতুন করে বিক্রয়চাপ শুরু হলে বেলা সোয়া ১২টায় সূচকটি পুনরায় ৫ হাজার ৩৬০ পয়েন্টে নেমে আসে। এ সময় ব্যাংক ও বীমা খাতের মূল্যবৃদ্ধি সূচককে আবার ওপরের দিকে টেনে নিয়ে যায়। এভাবে সূচকের উন্নতি দিয়েই লেনদেন শেষ করে ডিএসই।
তবে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের খুব বড় ধরনের ওঠানামা ঘটেনি। এখানে সিএসই সার্বিক মূল্যসূচকের ১০৮ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। বাজারটির অন্য দু’টি সূচকের মধ্যে সিএসই-৩০ ১০৬ দশমিক ৫৫ ও সিএসসিএক্স সূচক ৭২ দশমিক ৬৪ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ২৪ জুলাই সিএসইর উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বাজারটির লেনদেনের বড় ধরনের উন্নতি। আগের দিন ৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা লেনদেন করা বাজারটির ২৪ জুলাই ৫৬ কোটি ১৮ লাখ টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে। লেনদেনের মধ্যে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের ২৯ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ও লাভেলো আইসক্রিমের লেনদেন ছিল ১৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।
এ দিকে শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত জ¦ালানি ও বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারি সামিট গ্রুপের কোম্পানি খুলনা পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (কেপিসিএল) তাদের দ্বিতীয় বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি তুরস্কের আকসা এনার্জি ইউরেটিম এএসের কাছে বিক্রি করার চুক্তি করেছে। ১১৫ মেগাওয়াট মতার এই বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির সাথে সরকারের বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি (পিপিএ) নবায়ন না হওয়ায় ২০২৪ সালের মার্চ মাস থেকে অচল অবস্থায় ছিল এটি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ২৩ জুলাই দাখিল করা এক মূল্য সংবেদনশীল বিবৃতির মাধ্যমে কোম্পানিটি এই চুক্তির কথা জানিয়েছে। তবে এই লেনদেনের আর্থিক মূল্য প্রকাশ করা হয়নি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি খুলনা পাওয়ারের দ্বিতীয় বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রত্যাহারের ঘটনা। এর আগে কোম্পানিটি তাদের প্রথম ১১০ মেগাওয়াট বার্জ-মাউন্টেড বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি ১৫ মিলিয়ন ডলারে (প্রায় ১৩০ কোটি টাকা) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক্সেলেরেট গ্লোবাল অপারেশনস এলএলসির কাছে বিক্রির চুক্তি করেছিল।
বর্তমানে খুলনা পাওয়ারের একমাত্র আয়-উৎপাদনকারী সম্পদ হলো তাদের ১৫০ মেগাওয়াটের ইউনাইটেড পায়রা পাওয়ার প্লান্ট, যেখানে কোম্পানিটির ৩৫ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে। কোম্পানিটি সর্বশেষ ৩০ জুন, ২০২৪ অর্থ বছরে শেয়ার হোল্ডারদের ১০ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করলেও ঘোষিত ডিভিডেন্ড বিতরণ না করায় বর্তমানে এটি ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে লেনদেন হচ্ছে। সর্বশেষ অর্থ বছরে কোম্পানিটির শেয়ার প্রতি আয় হয়েছিল ১৫ পয়সা। ২৪ জুলাই কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ১১ দশমিক ৭০ টাকা।
প্রসঙ্গত, সামিট গ্রুপের কোম্পানি কেপিসিএল ২০১০ সালে পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্ত হয়। ওই সময় সরকারি কোম্পানি ছাড়া কোনো বেসরকারি কোম্পানি ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে পুঁজি বাজারে তালিকাভুক্তির সুযোগ না থাকলেও তৎকালীন আওয়ামী সরকারের ঘনিষ্ঠতার সুযোগে সামিট গ্রুপের দু’টি কোম্পানি খুলনা পাওয়ার কোম্পানি (কেপিসিএল) ও ওশ্যান কনটেইনার লিমিটেড (ওসিএল) একই দিন ডিরেক্ট লিস্টিং পদ্ধতিতে তালিকাভুক্তির সুযোগ পায়। ওই সময়ের পুঁজি বাজারের তেজিভাবকে কাজে লাগিয়ে দু’টি কোম্পানিই ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ার ২০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের গছিয়ে দেয়।
কিন্তু দুই বছর যেতে না যেতেই ২০১৩ সালের শুরুতে ওসিএলকে একই গ্রুপের তালিকাভুক্ত অপর কোম্পানি সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের সাথে একীভূত করে নেয়। আর ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার কেপিসিএলের সাথে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি নবায়ন না করায় কর্তৃপক্ষ খুলনা পাওয়ার প্লান্ট বন্ধ ঘোষণা করে। বর্তমানে সামিট গ্রুপের তালিকাভুক্ত অন্য কোম্পানিগুলোর মধ্যে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টের শেয়ারদর ২৩ টাকা। একই গ্রুপের আর এক কোম্পানি সামিট পাওয়ারের শেয়ারদর ১৫ টাকা। ●
অকা/পুঁবা/ফর/রাত/২৫ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ
সর্বশেষ হালনাগাদ 7 months আগে

