অর্থকাগজ প্রতিবেদন
দেশে ডলার-সংকট শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের শুরুতে। বৈশ্বিক বাজারে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানি তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেলে আমদানি ব্যয় ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এর আগে ২০২০-২১ অর্থবছরে যেখানে পণ্য আমদানিতে খরচ হয়েছিল ৬৫ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় রেকর্ড ৮৯ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে।

অতিরিক্ত আমদানি ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২২ সালের শুরু থেকেই আমদানি নিরুৎসাহিত করার জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে ছিল আমদানিতে শতভাগ নগদ মার্জিন বাধ্যতামূলক করা, কিছু পণ্যে বাড়তি শুল্ক আরোপ এবং ব্যাংকঋণ বন্ধ করা। এর ফলে ব্যবসায়ীদের এলসি খোলার জন্য পুরো অর্থ নিজের উৎস থেকে জমা দিতে হয়। এতে আমদানি খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।

ফলে ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি ব্যয় কমে দাঁড়ায় ৭৫ দশমিক শূন্য ৬ বিলিয়ন ডলার। এর পরের ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও কমে হয় ৬৬ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার। বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে আমদানিতে খরচ হয়েছে ৬৩ দশমিক ৯৬ বিলিয়ন ডলার।

গত বছরের আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে ডলার সংকট কাটাতে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ নেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ডলারের দাম বাজারভিত্তিক করা। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোর জন্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে লেনদেনের সুযোগ তৈরি করা হয়।

এই উদ্যোগের ফলে মুদ্রাবাজারে ডলারের প্রবাহ বাড়তে শুরু করে। একদিকে রফতানি আয় বেড়েছে, অন্যদিকে প্রবাসী আয়েও এসেছে বড় ধরনের উল্লম্ফন। বিদায়ী অর্থবছরে রেমিট্যান্স বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরের চেয়ে প্রায় ৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার বেশি (প্রবৃদ্ধি ২৭ শতাংশ)। অন্যদিকে পণ্য রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৮.৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার।

এই দুই উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ বা বৈদেশিক মুদ্রার মজুতও বাড়তে শুরু করেছে। ফলে মুদ্রাবাজারে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দূর হয়ে ডলারের দাম কমে এসেছে। বর্তমানে ব্যাংকিং চ্যানেলে ডলার ১২২ টাকার মধ্যে কেনাবেচা হচ্ছে।

বিদায়ী অর্থবছরে চলতি হিসাবের ঘাটতি কমেছে। বৈদেশিক বাণিজ্যে ভারসাম্য ফিরতে শুরু করেছে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডলারের বাজার স্থিতিশীল হওয়ায় আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ডলারের বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালুর পর ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে ডলার লেনদেনে আন্তর্জাতিক চর্চা অনুসরণ করছে। প্রবাসী আয়ের ডলার কেনায় ব্যাংকগুলো এখন সতর্ক, ফলে ব্যবসায়ীরাও আগের চেয়ে কম দামে ডলার পাচ্ছেন। উদ্বৃত্ত ডলার নিলামের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক কিনে নিচ্ছে, যা মুদ্রাবাজারকে স্থিতিশীল রাখছে।

তবে ডলার-সংকট কেটে গেলেও এখনো অনেক পণ্যের আমদানিতে কঠোর বিধিনিষেধ বহাল রয়েছে। বিলাসপণ্যসহ কয়েক ডজন পণ্য আমদানিতে এখনো শতভাগ নগদ মার্জিন দিতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে—মোটরকার, ইলেকট্রনিকস হোম অ্যাপ্লায়েন্স, স্বর্ণ ও স্বর্ণালংকার, মূল্যবান ধাতু, আসবাবপত্র, প্রসাধনী, ফল, ফুল, প্রক্রিয়াজাত খাদ্যদ্রব্য, পানীয়, চকলেট, জুস, সফট ড্রিংকস, তামাকজাত পণ্য ইত্যাদি। এসব পণ্যের জন্য ব্যাংকঋণও বন্ধ আছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই বিধিনিষেধ মূলত বিলাসপণ্য আমদানি কমিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ সামাল দিতে জারি করা হয়েছিল। তবে ব্যাংক খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এখন সংকট কেটে যাওয়ায় এসব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া জরুরি।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ডলার সংকট আপাতত কেটে গেছে। ডলারের দাম বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল। এখন আমদানিতে আরোপিত সব বিধিনিষেধ তুলে দেওয়া দরকার। এতে ব্যবসায়ীরা নতুন করে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে উদ্যোগী হবেন। দেশের অর্থনীতির ওপর আস্থা বাড়বে।’

অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল বৈদেশিক মুদ্রা বাজারের জন্য রফতানি বৈচিত্র্য, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বাড়ানো এবং বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা ও বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বজায় রাখাই হবে মূল চ্যালেঞ্জ। 
অকা/ব্যাংখা/ই/সকাল/২২ জুলাই, ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দ

সর্বশেষ হালনাগাদ 8 months আগে

Leave A Reply

Exit mobile version